Home ফ্যাক্ট ফাইল পঞ্চায়েতের পাঁচ কাহন পৌর বার্তা জেলার চালচিত্র চাষী ভাই বলছি শরীর স্বাস্থ্য জেলার সেনাপতি মাঠে ময়দানে বিনোদন সম্পাদকীয় কলম
BREAKING NEWS
আসানসোলে বিনিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ! বিপাকে ১০-১২ হাজার মানুষ, বন্ধ অফিস, উধাও কর্তারা   •   দক্ষিণবঙ্গে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ের সতর্কতা জারি   •   স্বচ্ছ ভারতের অঙ্গ হিসেবে আলিপুরদুয়ারের ভোলাডাবরি RPF কলোনিতে সাফাই অভিযান, প্রতি রবিবার পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ   •   পরিষেবা না পাওয়ার অভিযোগে রানিগঞ্জে আমরাসোতা পঞ্চায়েত অফিসে তালা ঝোলালেন স্থানীয়রা   •   প্রধানমন্ত্রীর বাবাকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগ, পানাগড়ে মল্লিকার্জুন খাড়গের কুশপুতুল দাহ বিজেপির   •   ভিন রাজ্যে দুর্গাপুরের কাঁকসার যুবকের রহস্যমৃত্যু, খুনের অভিযোগ পরিবারের

আসানসোলে বিনিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকার প্রতারণার অভিযোগ! বিপাকে ১০-১২ হাজার মানুষ, বন্ধ অফিস, উধাও কর্তারা

27 Oct 2026
11:15 AM


নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক:  প্রোডাক্টভিত্তিক সংস্থায় বিনিয়োগ করে মোটা অঙ্কের রিটার্ন পাওয়ার আশায় টাকা জমা দিয়েছিলেন বহু মানুষ। প্রথম দিকে নিয়মিত রিটার্ন পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাসও বেড়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, সেই বিশ্বাসকে হাতিয়ার করেই ধাপে ধাপে বিপুল পরিমাণ টাকা তোলা হয়। এরপর পুজোর আগে আচমকাই বন্ধ হয়ে যায় অফিস। মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়েও সাড়া মিলছে না বলে দাবি বিনিয়োগকারীদের। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসানসোল ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

পীড়িতদের অভিযোগ, এই প্রতারণার জাল শুধু আসানসোলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলা থেকে শুরু করে ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছিল এই নেটওয়ার্ক। তাঁদের দাবি, প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকার আর্থিক প্রতারণা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ১০ থেকে ১২ হাজারের কাছাকাছি। যদিও প্রতারণার মোট অঙ্ক, ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা এবং অভিযোগের অন্যান্য দিক এখনও স্বাধীনভাবে বা সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা যায়নি।

প্রথমে রিটার্ন, পরে অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রলোভন

অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি প্রায় এক বছর চার মাস ধরে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালিয়েছিল। এই সময়ে বিনিয়োগকারীদের একাংশ নিয়মিত রিটার্নও পেয়েছিলেন বলে দাবি। ফলে সংস্থাটির ব্যবসায়িক মডেলের উপর তাঁদের আস্থা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে মল খোলা, ব্যবসার পরিধি বাড়ানো এবং নতুন প্রকল্প চালু করার কথা বলে আরও বেশি টাকা বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা হয় বলে অভিযোগ।

প্রথম দিকে টাকা ফেরত পাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকায় অনেকেই নতুন করে বিনিয়োগ করেন বলে জানিয়েছেন পীড়িতরা। কেউ নিজের সঞ্চয়ের টাকা, কেউ আবার পরিচিতদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন বলে অভিযোগ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের অনেকেই এখন নিজেদের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

অভিযোগ, পুজোর আগে থেকেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে টাকা তোলা ও রিটার্ন পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। একসময় অফিস বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে দাবি বিনিয়োগকারীদের।

স্থানীয় পরিচিতির উপর ভরসা করেই বিনিয়োগ?

এই ঘটনায় পুরুলিয়ার সাঁতাল মোড়ের বাসিন্দা সন্দীপ বাউরির নাম উঠে এসেছে অভিযোগকারীদের বক্তব্যে। তাঁদের দাবি, সন্দীপ বাউরি বিভিন্ন মানুষকে ওই সংস্থায় টাকা বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। স্থানীয় পরিচিতি এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের সূত্র ধরেই অনেকের কাছে বিনিয়োগের প্রস্তাব পৌঁছেছিল বলে অভিযোগ।

পীড়িতদের আরও দাবি, সন্দীপ বাউরির স্ত্রী পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে কর্মরত এবং সাঁকতোড়িয়া ফাঁড়িতে তাঁর পোস্টিং রয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। এই পরিচয়ের কথা শুনে অনেকে সংস্থাটিকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেছিলেন বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য।

তবে এই সমস্ত দাবি এখনও তদন্তসাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা, তাঁদের সঙ্গে সংস্থার সম্পর্ক এবং পুলিশের কর্মরত কোনও ব্যক্তির এই ঘটনায় আদৌ কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া সম্ভব। অভিযোগ ওঠা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।

কলকাতা ও রূপনারায়ণপুরের অফিস বন্ধ, ফোনেও যোগাযোগ নেই

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, কয়েক দিন আগে মাথাপিছু এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত টাকা তোলার অনুমতি বা সেই সংক্রান্ত প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর কলকাতা ও রূপনারায়ণপুরে থাকা সংস্থার দুটি অফিস বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি তাঁদের।

পীড়িতদের আরও বক্তব্য, গত প্রায় ১৫ দিন ধরে মালিকপক্ষের ফোন বন্ধ রয়েছে। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনও সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ। অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। নিজেদের বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় অনেকে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন।

এই ঘটনায় রূপনারায়ণপুরের অনিল, রঘুনাথপুরের সুশান্ত দাস এবং সাবির আনসারির নামও অভিযোগকারীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে তাঁদের প্রত্যেকের নির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তদন্তের আগে কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

প্রোডাক্ট বিক্রির কমিশন মডেল, একাধিক সংস্থার নাম

অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সংস্থার তরফে দাবি করা হতো যে প্রোডাক্ট বিক্রির মাধ্যমে কমিশনভিত্তিক ব্যবসা পরিচালিত হয়। ব্যবসার সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনার কথাও বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়েছিল বলে অভিযোগ।

এই সূত্রে ঋদ্ধি-সিদ্ধি কনস্ট্রাকশন, স্মৃতি গ্রুপ-সহ একাধিক সংস্থার নাম সামনে এসেছে। বিনিয়োগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সংস্থার নাম উল্লেখ করে ব্যবসার বিশ্বাসযোগ্যতা তুলে ধরা হতো। তবে ওই সংস্থাগুলির প্রকৃত ভূমিকা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বিনিয়োগ সংগ্রহের সঙ্গে তাদের কোনও প্রত্যক্ষ যোগ ছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

পীড়িতদের বক্তব্য, স্মৃতি গ্রুপ ও হলি লাভা দেবের নামে ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার, ইউপিআই, আরটিজিএস এবং এনইএফটির মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের দাবি, টাকা পাঠানোর প্রমাণ হিসেবে ব্যাঙ্কের লেনদেনের নথিও রয়েছে। এই নথিগুলি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তবে ব্যাঙ্কে টাকা স্থানান্তরের প্রমাণ থাকলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। লেনদেনের উদ্দেশ্য, প্রাপক এবং অর্থের পরবর্তী গতিপথ খতিয়ে দেখা জরুরি।

আসানসোল থেকে ঝাড়খণ্ড—বিস্তৃত নেটওয়ার্কের অভিযোগ

এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, বিনিয়োগ সংগ্রহের নেটওয়ার্ক বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল। পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল, পুরুলিয়া, রঘুনাথপুর, লিতুরিয়া, বাঁকুড়া, সালতোড়া, মেদিনীপুর এবং কলকাতার পাশাপাশি ঝাড়খণ্ডের রাঁচি, ধানবাদ, জামতাড়া, বোকারো, দুমকা, গিরিডি, মধুপুর ও দেওঘরেও এই নেটওয়ার্কের বিস্তার ছিল বলে অভিযোগ।

বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হয়ে থাকলে তদন্তের পরিধিও বড় হতে পারে। কতজন বিনিয়োগকারী প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কত টাকা জমা পড়েছে, কারা টাকা সংগ্রহ করেছেন এবং অর্থ কোন কোন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে গিয়েছে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

একই সঙ্গে, অভিযোগকারীদের দাবি করা ৮০ থেকে ৯০ কোটি টাকার অঙ্ক এবং ১০ থেকে ১২ হাজার ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যাও নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন। সমস্ত অভিযোগ, ব্যাঙ্কের লেনদেনের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার আর্থিক নথি খতিয়ে দেখলেই প্রকৃত ছবিটি সামনে আসতে পারে।

এসিপি অফিসে লিখিত অভিযোগ, তদন্তের দাবি বিনিয়োগকারীদের

মঙ্গলবার প্রতারিত বলে দাবি করা একদল বিনিয়োগকারী আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের এসিপি অফিসে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। তাঁদের দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পত্তি ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন খতিয়ে দেখার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

বিনিয়োগকারীদের প্রধান দাবি, তাঁদের জমা রাখা অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, বহু মানুষ নিজেদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করেছিলেন। কেউ কেউ পরিচিতদের কথায় ভরসা করে টাকা দিয়েছিলেন। ফলে এই ঘটনার আর্থিক প্রভাব বহু পরিবারের উপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

তবে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অর্থের গতিপথ অনুসন্ধান, সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য যাচাই এবং টাকা ফেরতের সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আদালতের নির্দেশের উপর নির্ভর করবে।

এখন নজর পুলিশের তদন্তে

এই মুহূর্তে ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অর্থের প্রকৃত গতিপথ খুঁজে বের করা। সংস্থাটি কীভাবে বিনিয়োগ সংগ্রহ করত, বিনিয়োগকারীদের কী ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রতিশ্রুতি লিখিত চুক্তিতে ছিল কি না এবং অফিস বন্ধ হওয়ার আগে কী ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়েছে—এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পাশাপাশি, সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন জেলায় টাকা সংগ্রহের পদ্ধতি সম্পর্কেও তদন্ত হওয়া জরুরি। অভিযোগকারীদের দেওয়া ব্যাঙ্ক রেকর্ড, লেনদেনের রসিদ, চুক্তিপত্র, বার্তা ও অন্যান্য নথি তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এখনও পর্যন্ত এই ঘটনার বিষয়ে পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ এবং সরকারি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত প্রতারণার মোট অঙ্ক, ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা এবং অভিযুক্তদের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে, আসানসোলে বিনিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকা প্রতারণার অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। হাজার হাজার মানুষের অর্থ আটকে যাওয়ার দাবি সামনে আসায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা এবং আইন মেনে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের পথ খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।