নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: হাসপাতাল মানেই অনেক শিশুর কাছে অজানা পরিবেশ, ভয়, উদ্বেগ আর মানসিক চাপ। চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও হাসপাতালের পরিবেশ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপ শিশুদের মনে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। সেই ভয় কিছুটা কমিয়ে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং চিকিৎসার পরিবেশকে আরও আনন্দদায়ক করে তুলতে অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ‘ডিস্ট্রিক্ট গ্র্যান্ড লজ অফ বেঙ্গল’। তাদের উদ্যোগে পরিচালিত ‘টেডিস ফর লাভিং কেয়ার’ (TLC) কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু রোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে আদুরে টেডি বিয়ার।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য, চিকিৎসার কঠিন সময়ে শিশুদের মানসিক স্বস্তি দেওয়া এবং হাসপাতালের পরিবেশকে আরও শিশুবান্ধব করে তোলা। একটি ছোট্ট খেলনা কীভাবে কোনও শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে পারে, তারই মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে এই কর্মসূচি।
সম্প্রতি কলকাতার ফ্রিম্যাসনস হলে ‘টেডিস ফর লাভিং কেয়ার’ কর্মসূচিকে সমর্থন জানাতে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ডাঃ শরদ্বত মুখোপাধ্যায়। শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগকে তিনি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী বলে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে শুধু শারীরিক সুস্থতার দিকেই নজর দিলে চলবে না, তাদের মানসিক স্বস্তি এবং আবেগের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। হাসপাতালের পরিবেশে একটি ছোট্ট টেডি বিয়ারও শিশুদের মনে নিরাপত্তা ও আনন্দের অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
‘ডিস্ট্রিক্ট গ্র্যান্ড লজ অফ বেঙ্গল’-এর এই উদ্যোগ তাই শুধুমাত্র খেলনা বিতরণের কর্মসূচি নয়; বরং শিশুদের প্রতি যত্ন, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার এক বিশেষ প্রকাশ।
শিশুদের কাছে হাসপাতাল অনেক সময় ভীতিকর জায়গা হয়ে ওঠে। অপরিচিত চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসার সরঞ্জাম কিংবা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিবেশ তাদের মনে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের পক্ষে নিজেদের ভয় বা অস্বস্তির কথা স্পষ্ট করে বোঝানো কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে পরিচিত ও আদুরে কোনও খেলনা শিশুর মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে। ‘টেডিস ফর লাভিং কেয়ার’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া টেডি বিয়ার সেই কাজটিই করতে পারে বলে উদ্যোগটির ভাবনা।
একটি নরম খেলনা শিশুর কাছে সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। হাসপাতালের অপরিচিত পরিবেশে সেটিকে জড়িয়ে ধরে থাকা কিংবা তার সঙ্গে সময় কাটানো শিশুকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। চিকিৎসার আগে বা পরে মানসিক চাপের মুহূর্তে এই ছোট্ট উপহার শিশুর মন ভালো করার একটি সহজ উপায় হতে পারে।
চিকিৎসার সময় শিশুদের উদ্বেগ কমানোর জন্য মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। একে সাধারণভাবে ‘ডিস্ট্রাকশন থেরাপি’ বলা হয়। গল্প বলা, খেলনা দিয়ে খেলানো, ছবি আঁকা কিংবা গান শোনানোর মতো কার্যকলাপ শিশুদের ভয় ও অস্বস্তি সামলাতে সাহায্য করতে পারে।
টেডি বিয়ারও এই ধরনের সহায়ক পদ্ধতির অংশ হতে পারে। খেলনাটির প্রতি শিশুর মনোযোগ আকৃষ্ট হলে চিকিৎসার পরিবেশ নিয়ে তার উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে শিশুর যোগাযোগ সহজ করতেও এই উদ্যোগ সহায়ক হতে পারে।
তবে মনে রাখা জরুরি, খেলনা চিকিৎসার বিকল্প নয়। এটি শিশুদের মানসিক স্বস্তি দেওয়ার একটি সহায়ক মাধ্যম। শিশুর শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনও শিশু যদি হাসপাতালের পরিবেশে খুব ভয় পায়, তাহলে তার সঙ্গে কথা বলা, চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বোঝানো কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় তাকে সহযোগিতা করানো কঠিন হতে পারে।
এই ক্ষেত্রে খেলনা বা পরিচিত কোনও বস্তু শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের একটি সহজ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। টেডি বিয়ার হাতে পেলে শিশুরা কিছুটা স্বাভাবিক বোধ করতে পারে এবং চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে ধীরে ধীরে স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে পারে।
ফলে ‘টেডিস ফর লাভিং কেয়ার’-এর মতো উদ্যোগ শিশুদের মানসিক স্বস্তির পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরির ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।
সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মানবিক উদ্যোগের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষত শিশুদের চিকিৎসার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে সামান্য সহায়তাও অনেক বড় অর্থ বহন করতে পারে।
‘টেডিস ফর লাভিং কেয়ার’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন শিশু ওয়ার্ড ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশুদের হাতে টেডি বিয়ার তুলে দেওয়ার ভাবনা সেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। এই উদ্যোগ শিশুদের চিকিৎসার অভিজ্ঞতাকে আরও কোমল ও আনন্দদায়ক করে তোলার প্রচেষ্টা।
এই কাজের জন্য ‘ডিস্ট্রিক্ট গ্র্যান্ড লজ অফ বেঙ্গল’-কে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ডাঃ শরদ্বত মুখোপাধ্যায়। তাঁর মতে, একটি সাধারণ টেডি বিয়ার যে কোনও শিশুর কঠিন সময়ে কতটা আনন্দ ও স্বস্তির কারণ হতে পারে, তা প্রত্যক্ষ করা সত্যিই তৃপ্তিদায়ক।
স্বাস্থ্য পরিষেবার মান নির্ধারণে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর মানসিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ, চিকিৎসার সময় তৈরি হওয়া ভয় ও উদ্বেগ তাদের সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
হাসপাতালে শিশুদের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা, তাদের সঙ্গে ধৈর্য ধরে কথা বলা, চিকিৎসার প্রক্রিয়া বয়স অনুযায়ী বোঝানো এবং প্রয়োজনে খেলনা বা গল্পের সাহায্য নেওয়া—এসবই শিশুদের স্বস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
‘টেডিস ফর লাভিং কেয়ার’-এর মতো উদ্যোগ সেই লক্ষ্য পূরণের পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। একটি ছোট্ট খেলনা হয়তো কোনও শিশুর অসুস্থতা দূর করতে পারে না, কিন্তু তার মুখে হাসি ফোটাতে পারে, ভয়ের মুহূর্তে কিছুটা সাহস জোগাতে পারে এবং হাসপাতালের পরিবেশকে তার কাছে একটু বেশি আপন করে তুলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, শিশুদের সুস্থতার অর্থ শুধু রোগমুক্ত হওয়া নয়, বরং চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে তাদের প্রতি যত্ন, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার প্রকাশও। কলকাতার ফ্রিম্যাসনস হলে সমর্থন পাওয়া ‘টেডিস ফর লাভিং কেয়ার’ কর্মসূচি সেই মানবিক বার্তাই তুলে ধরছে—শিশুদের পাশে থাকতে কখনও কখনও একটি ছোট্ট টেডি বিয়ারই হয়ে উঠতে পারে বড় আনন্দের উৎস।