নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ধান চাষের ক্ষেত্রে বুটিং বা থোড় আসার পর্যায় এবং মিল্কিং বা দানা গঠনের প্রাথমিক পর্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে ধানগাছে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। সময়মতো পোকা শনাক্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ধানের শিষ, দানা গঠন এবং শেষ পর্যন্ত ফলনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জমির নিয়মিত পরিচর্যা ও নজরদারির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ধানের বুটিং পর্যায়ে শিষ পাতার খোলের ভিতরে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী সময়ে শিষ বেরিয়ে আসে এবং ফুল ফোটা ও দানা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। মিল্কিং পর্যায়ে ধানের দানার ভিতরে দুধের মতো তরল পদার্থ তৈরি হতে থাকে। এই সময়ে পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে দানা অপুষ্ট হতে পারে এবং ধানের গুণমান ও ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ধানের বুটিং ও মিল্কিং পর্যায়ে জমির পরিবেশ, আবহাওয়া এবং ধানের জাত অনুযায়ী বিভিন্ন পোকামাকড়ের উপস্থিতি দেখা যায়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পোকা হল—
১. মাজরা পোকা: মাজরা পোকার শূককীট ধানগাছের কাণ্ডের ভিতরে প্রবেশ করে ক্ষতি করতে পারে। গাছের বৃদ্ধির পর্যায় অনুযায়ী শিষের ক্ষতি হতে পারে। শিষ বেরিয়ে আসার সময় শিষ সাদা বা শুকনো হয়ে গেলে তার কারণ পরীক্ষা করা জরুরি।
২. বাদামি শোষক পোকা: এই পোকা ধানগাছের গোড়ার কাছে অবস্থান করে গাছের রস শোষণ করে। আক্রমণ বেশি হলে গাছ হলদে হয়ে শুকিয়ে যেতে পারে এবং জমির কিছু অংশে পোড়া দাগের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
৩. গন্ধি পোকা: ধানের দানা গঠনের সময় এই পোকা দানার রস শোষণ করে ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে দুধ অবস্থায় থাকা দানায় আক্রমণ হলে দানা অপুষ্ট বা বিবর্ণ হতে পারে।
৪. শিষকাটা ও শিষের ক্ষতিকারক অন্যান্য পোকা: কিছু পোকা শিষ বা দানার বিভিন্ন অংশে ক্ষতি করতে পারে। তবে শুধু শিষ শুকিয়ে যাওয়া দেখেই নির্দিষ্ট পোকাকে দায়ী করা ঠিক নয়; জমির লক্ষণ ও পোকার উপস্থিতি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বুটিং পর্যায়ে ধানগাছের শিষ পাতার খোলের মধ্যে বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হলে পরবর্তী সময়ে শিষ বেরোনো, ফুল ফোটা এবং দানা গঠনে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই কৃষকদের নিয়মিত জমিতে গিয়ে গাছের অবস্থা পরীক্ষা করা উচিত। পাতার রং পরিবর্তন, গাছের গোড়ায় পোকা, শিষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং শুকিয়ে যাওয়া অংশের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। জমির একাধিক স্থানে নমুনা পরীক্ষা করলে পোকার আক্রমণের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
মিল্কিং পর্যায়ে ধানের দানার ভিতরে পুষ্টি জমা হতে থাকে। এই সময়ে গন্ধি পোকাসহ দানার ক্ষতিকারক পোকামাকড়ের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজরে রাখা দরকার।
কৃষকদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে পোকামাকড়ের উপস্থিতি ও ক্ষতির লক্ষণ শনাক্ত করুন।
জমিতে উপকারী পোকামাকড় ও প্রাকৃতিক শত্রু সংরক্ষণ করুন।
অকারণে কীটনাশক ব্যবহার করবেন না; পোকার প্রজাতি ও আক্রমণের মাত্রা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিন।
প্রয়োজনে স্থানীয় কৃষি দপ্তর বা কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
কীটনাশক ব্যবহার করতে হলে ধানের নির্দিষ্ট পর্যায়ে অনুমোদিত ওষুধ, সঠিক মাত্রা, নিরাপত্তাবিধি এবং ফসল কাটার আগে অপেক্ষার সময় মেনে চলুন।
পোকামাকড়ের আক্রমণের আশঙ্কায় অনেক সময় কৃষকেরা আগাম কীটনাশক প্রয়োগ করেন। কিন্তু পোকা শনাক্ত না করে ও প্রয়োজনীয় মাত্রা নির্ধারণ না করে ওষুধ ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে, উপকারী পোকা নষ্ট হতে পারে এবং কীটনাশক-প্রতিরোধী পোকার সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তাই সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, সঠিক কৃষি পরিচর্যা, প্রাকৃতিক শত্রু সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার।
ধানের বুটিং ও মিল্কিং পর্যায়ে জমির প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া হলে পোকামাকড়ের আক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। এতে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার কমানো এবং ফসলের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
সব মিলিয়ে, ধানের থোড় আসা থেকে দানা গঠনের প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ, পোকা সঠিকভাবে শনাক্তকরণ এবং কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণই সুস্থ ফসল ও ভালো ফলন নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।