নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া শক্তিশালী টাইফুন ‘চামপি’কে ঘিরে পূর্ব এশিয়ার একাধিক অঞ্চলে বাড়ছে উদ্বেগ। ঝড়টির প্রভাবে তাইওয়ানে স্থল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, ভারী বৃষ্টি এবং উপকূলে বিশাল ঢেউয়ের আশঙ্কায় প্রশাসনকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ব্যাহত হয়েছে বিমান চলাচলও। রয়টার্সের ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাইওয়ান ও জাপান মিলিয়ে ২০০-র বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। একই সঙ্গে ঝড়ের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ সামরিক মহড়া ‘কিন সোর্ড’-এর কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, টাইফুনটি কিছুটা দুর্বল হলেও এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। ঝড়ের কেন্দ্রের কাছে বাতাসের ঝাপটার গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৭ কিলোমিটারের বেশি বলে জানিয়েছে তাইওয়ানের সেন্ট্রাল ওয়েদার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। ঝড়টির গতিপথ অনুযায়ী, এটি তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছ দিয়ে এগিয়ে পরে উত্তর দিকে মোড় নিতে পারে। এরপর চীনের উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ জাপানের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
টাইফুন ‘চামপি’র আগমন ঘিরে বৃহস্পতিবার তাইওয়ানে স্থল সতর্কতা জারি করা হয়। ঝড়ের প্রভাব শুধু উপকূলীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, দ্বীপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবহাওয়া প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঝড়টির বিস্তৃতি বেড়ে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার হয়েছে। ফলে তাইওয়ানের বড় অংশ ঝড়ের প্রভাবের আওতায় আসতে পারে।
উপকূলবর্তী এলাকায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাসিন্দাদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। সেখানে ছয় মিটারের বেশি উচ্চতার ঢেউয়ের আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, তাইওয়ানের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় এক মিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। রাজধানী তাইপেইয়ের আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চলও এই বৃষ্টির ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
প্রবল বৃষ্টির ফলে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস, নিচু অঞ্চলে জল জমে যাওয়া এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কা রয়েছে। উপকূলে শক্তিশালী ঢেউ ও ঝোড়ো হাওয়া সামুদ্রিক পরিবহণের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রশাসনের তরফে বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং আবহাওয়ার নির্দেশ মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
টাইফুন ‘চামপি’ চলতি বছরের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী ঝড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এক পর্যায়ে এটি সুপার টাইফুনের শক্তিতে পৌঁছেছিল। বৃহস্পতিবার কিছুটা দুর্বল হওয়ার পরও ঝড়টির কেন্দ্রের কাছে বাতাসের ঝাপটার গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৭ কিলোমিটারের বেশি ছিল বলে তাইওয়ানের আবহাওয়া প্রশাসন জানিয়েছে। <Cite refs={["turn800222view0","turn853995search8"]}/>
টাইফুনের শক্তি নির্ধারণে বাতাসের স্থায়ী গতিবেগ এবং সর্বোচ্চ ঝাপটার গতিবেগ আলাদা বিষয়। ঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের ঝাপটা অত্যন্ত শক্তিশালী হলে ঘরবাড়ি, গাছপালা, বিদ্যুতের খুঁটি এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে। একই সঙ্গে ভারী বৃষ্টির কারণে ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
তবে ঝড়ের তীব্রতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। সমুদ্রের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতি এবং ঝড়ের গতিপথের ওপর নির্ভর করে এটি আরও দুর্বল হতে পারে অথবা কিছু সময় শক্তিশালী থাকতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের আবহাওয়ার বুলেটিনের ভিত্তিতেই পরিস্থিতি বিচার করা জরুরি।
টাইফুনের প্রভাবে বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে তাইওয়ান ও জাপান মিলিয়ে ২০০-র বেশি ফ্লাইট বাতিলের কথা বলা হয়েছে। তাইওয়ানের পরিবহণ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সেখানে ১২৫টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, যার অধিকাংশই অভ্যন্তরীণ রুটের।
জাপানেও বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। জাপান এয়ারলাইন্স, অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ বা এএনএ এবং স্কাইমার্কের মতো বিমান সংস্থা বৃহস্পতিবার থেকে রবিবারের মধ্যে ১০০-র বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর ফলে ১১ হাজারের বেশি যাত্রীর যাত্রাপরিকল্পনা ব্যাহত হয়েছে।
বিমান বাতিলের ফলে যাত্রীদের বিকল্প যাত্রাপথ খোঁজা, টিকিট পুনর্নির্ধারণ এবং হোটেলে অতিরিক্ত সময় কাটানোর মতো সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে। ঝড়ের গতিপথ পরিবর্তিত হলে আরও ফ্লাইটের সময়সূচি বদলানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
যাত্রীদের ক্ষেত্রে বিমান সংস্থার সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তাইওয়ান, ওকিনাওয়া এবং আশপাশের দ্বীপগুলির মধ্যে যাতায়াতের পরিকল্পনা থাকলে যাত্রার আগে ফ্লাইটের অবস্থা যাচাই করা উচিত।
বিমান চলাচল ব্যাহত হলেও রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাইওয়ানের রেল পরিষেবায় বড় ধরনের প্রভাবের খবর পাওয়া যায়নি। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তখনও বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কোনও খবর প্রশাসনের কাছে ছিল না। তবে ঝড়ের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় পরিবহণ ব্যবস্থা সচল রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই যাত্রী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। তাই আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবহণ সংস্থাগুলি পরিষেবা সীমিত করতে বা সময়সূচি বদলাতে পারে।
টাইফুন ‘চামপি’র প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ সামরিক মহড়া ‘কিন সোর্ড’-এর কর্মসূচিতেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। তাইওয়ানের কাছাকাছি জাপানি দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে চলা এই মহড়ায় স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে সমন্বিত সামরিক কার্যক্রমের অনুশীলন করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মহড়া প্রতি দুই বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। চলতি মহড়া সোমবার শুরু হয়েছে এবং এতে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫৬ হাজার সামরিক কর্মী অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি ফিলিপাইন ও অস্ট্রেলিয়াসহ আরও পাঁচটি দেশের বাহিনীও যুক্ত রয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
মহড়ায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, উভচর অবতরণ এবং স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে বিভিন্ন ধরনের সমন্বিত কার্যক্রমের অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু প্রবল ঝড়ের আশঙ্কায় নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণস্থলে কার্যক্রম চালানো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মসূচি প্রতিদিন পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বড় আকারের সামরিক পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করতে পারে। ঝড়ের সময় উড়োজাহাজ, হেলিকপ্টার, নৌযান এবং স্থলভিত্তিক প্রশিক্ষণ পরিচালনার ক্ষেত্রে আবহাওয়ার উপযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাইওয়ানের আবহাওয়া প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ঝড়টির কেন্দ্র তাইওয়ানের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে প্রায় ৫২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থান করছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছ দিয়ে এগিয়ে উত্তর দিকে মোড় নিতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে চীনের উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়ে দক্ষিণ জাপানের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাপানের ওকিনাওয়া প্রদেশের ইয়োনাগুনি দ্বীপও ঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথের কাছাকাছি রয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলে বিমান চলাচল ও স্থানীয় পরিবহণের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে ঝড়ের গতিপথে সামান্য পরিবর্তন হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বাতাসের তীব্রতা বদলে যেতে পারে।
আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, তাইওয়ানে ঝড়ের প্রভাব প্রায় দুই দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। এই সময়ে ভারী বৃষ্টি, শক্তিশালী বাতাস এবং উপকূলে বড় ঢেউয়ের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
টাইফুনের মতো শক্তিশালী ঝড়ের সময় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং ভূমিধসপ্রবণ স্থানে বসবাসকারীদের আবহাওয়ার সতর্কবার্তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে বাসিন্দাদের আগাম প্রস্তুতি নিতে এবং পাহাড় ও উপকূলীয় এলাকায় যাওয়া এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা—আগে থেকে বেশি সতর্কতা নিলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
দুর্যোগের সময় জরুরি ওষুধ, পানীয় জল, প্রয়োজনীয় খাবার, চার্জ করা মোবাইল ফোন এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য হাতের কাছে রাখা সহায়ক হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ ছাড়া বিপজ্জনক উপকূল বা পাহাড়ি এলাকায় যাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। পাশাপাশি বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়া, গাছ উপড়ে যাওয়া কিংবা জল জমে থাকা রাস্তা থেকে দূরে থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
শক্তিশালী টাইফুন ‘চামপি’কে ঘিরে তাইওয়ান ও জাপানে সতর্কতা জারি রয়েছে। প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি এবং বড় ঢেউয়ের আশঙ্কার পাশাপাশি বিমান চলাচল ও সামরিক প্রশিক্ষণেও এর প্রভাব পড়েছে। তাইওয়ানে ১২৫টি ফ্লাইট বাতিল এবং জাপানে ১০০-র বেশি ফ্লাইট বাতিলের খবর প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের যৌথ ‘কিন সোর্ড’ মহড়ার কর্মসূচি নিরাপত্তার স্বার্থে বদলানো হয়েছে।
ঝড়টি কিছুটা দুর্বল হলেও তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করছে পরবর্তী গতিপথ ও আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর। তাইওয়ান, জাপানের দক্ষিণাঞ্চল এবং আশপাশের দ্বীপগুলির বাসিন্দা ও যাত্রীদের জন্য আগামী সময়ে সরকারি সতর্কবার্তা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হল মানুষের নিরাপত্তা, পরিবহণ ব্যবস্থার ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ। টাইফুন ‘চামপি’র গতিপথের দিকে তাই নজর রাখছে গোটা পূর্ব এশিয়া।