নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ইংরেজিতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে, “An apple a day keeps the doctor away”। অর্থাৎ, প্রতিদিন একটি আপেল খেলে ডাক্তারকে দূরে রাখা যায়। যদিও এই কথাটি আক্ষরিক অর্থে সম্পূর্ণ সত্য নয়, তবে আপেলের পুষ্টিগুণ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ভিটামিন, খনিজ পদার্থ, খাদ্যআঁশ এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টে সমৃদ্ধ এই ফল সুষম খাদ্যতালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
আপেল সহজলভ্য, সুস্বাদু এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষের জন্য উপযোগী একটি ফল। এতে থাকা খাদ্যআঁশ হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে, আর বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু আপেল খেলেই সব রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সুস্থ থাকতে প্রয়োজন সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
জেনে নেওয়া যাক, নিয়মিত আপেল খাওয়ার ১০টি উল্লেখযোগ্য উপকারিতা।
আপেলে রয়েছে খাদ্যআঁশ, বিশেষ করে পেকটিন নামের এক ধরনের দ্রবণীয় আঁশ। এই আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত আঁশ গ্রহণ করলে মলত্যাগের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি কমাতে সুবিধা হতে পারে।
এ ছাড়া আপেলের কিছু আঁশ অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে অন্ত্রের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে আপেল সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু আপেল খাওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জল পান করা এবং অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার, যেমন শাকসবজি, ডাল ও গোটা শস্য খাওয়াও জরুরি।
আপেলে থাকা দ্রবণীয় আঁশ রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। আপেলের খোসায় বিভিন্ন পলিফেনল ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টও রয়েছে, যা শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
নিয়মিত ফল খাওয়া, শাকসবজি গ্রহণ, শরীরচর্চা এবং ধূমপান এড়িয়ে চলা হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখার গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
তবে আপেল কোনও হৃদ্রোগের ওষুধের বিকল্প নয়। কোলেস্টেরল বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আপেল একটি ভালো জলখাবার হতে পারে। একটি মাঝারি আকারের আপেলে সাধারণত প্রায় ৯৫ ক্যালোরি থাকে। এতে জল ও খাদ্যআঁশ থাকায় খাওয়ার পর কিছুটা সময় পেট ভরা অনুভূত হতে পারে।
বিস্কুট, মিষ্টি বা অতিরিক্ত চিনি দেওয়া খাবারের পরিবর্তে গোটা আপেল খেলে দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে।
তবে ওজন কমানো বা বাড়ানোর বিষয়টি নির্ভর করে সারাদিনে মোট কত ক্যালোরি গ্রহণ করা হচ্ছে, কতটা শারীরিক পরিশ্রম হচ্ছে এবং ব্যক্তির বিপাকীয় চাহিদার উপর। শুধু আপেল খেলেই ওজন কমে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।
আপেলে ভিটামিন সি এবং বিভিন্ন পলিফেনলজাতীয় উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে। এগুলির মধ্যে কিছু অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে কাজ করে এবং শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
দীর্ঘমেয়াদি অক্সিডেটিভ চাপ শরীরের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলমূল ও শাকসবজিতে বৈচিত্র্য রেখে খাবার খেলে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট পাওয়া যায়।
আপেলের খোসায়ও অনেক উপকারী উদ্ভিজ্জ উপাদান থাকে। তাই পরিষ্কার জল দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে খোসাসহ আপেল খাওয়া যেতে পারে।
আপেলে প্রাকৃতিক শর্করা থাকলেও গোটা ফলে খাদ্যআঁশও থাকে। এই আঁশ হজম ও শর্করা শোষণের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে গোটা আপেল খাওয়া এবং আপেলের রস পান করার মধ্যে পুষ্টিগত পার্থক্য রয়েছে।
আপেলের রসের তুলনায় গোটা আপেলে সাধারণত বেশি আঁশ থাকে এবং এটি চিবিয়ে খেতে হয়। তাই সুষম খাদ্যতালিকায় গোটা আপেল রাখা অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে।
তবে ডায়াবেটিস থাকলে আপেল খাওয়ার পরিমাণ ও মোট কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। আপেল খেলেই রক্তে শর্করা বাড়বে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যক্তিগত খাদ্যপরিকল্পনার জন্য চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আপেলে থাকা পলিফেনলজাতীয় উপাদান নিয়ে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ও বয়সজনিত পরিবর্তন সংক্রান্ত গবেষণা হয়েছে। পরীক্ষাগার ও কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, মানুষের স্মৃতিশক্তি বাড়ানো বা ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে আপেলের সরাসরি প্রভাব সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি।
তাই মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য আপেলকে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যের অংশ হিসেবে দেখা উচিত, কোনও নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধের নিশ্চয়তা হিসেবে নয়।
পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, মানসিক সক্রিয়তা এবং সুষম খাবার মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
আপেলে কিছু পরিমাণ ভিটামিন সি থাকে। এই ভিটামিন শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার কাজ এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আপেলে থাকা অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদানও সামগ্রিক পুষ্টিতে অবদান রাখে।
তবে আপেল ভিটামিন সি-এর সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎসগুলির একটি নয়। পেয়ারা, আমলকি, কমলালেবু এবং অন্যান্য ফল থেকেও ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি, পর্যাপ্ত প্রোটিন, ঘুম এবং নিয়মিত শরীরচর্চার উপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আপেলে প্রচুর পরিমাণে জল থাকে। ফলে এটি দৈনিক জল গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছুটা অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে গরমের দিনে ফল খাওয়া শরীরকে জল ও পুষ্টি সরবরাহের একটি সহজ উপায়।
তবে আপেল জল পানের বিকল্প নয়। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত জল পান করা জরুরি। গরম আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের অবস্থার উপর দৈনিক জল চাহিদা নির্ভর করে।
আপেল কামড়ে খেতে হয় বলে চিবানোর সময় মুখে লালারস নিঃসরণ বাড়তে পারে। লালারস মুখের অম্লতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে আপেল খেলে দাঁত নিজে থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় বা দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধ নিশ্চিত হয়—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
আপেলে প্রাকৃতিক শর্করা ও অম্লও রয়েছে। তাই আপেল খাওয়ার পর মুখ জল দিয়ে কুলকুচি করা ভালো অভ্যাস হতে পারে। দাঁত সুস্থ রাখতে দিনে দুবার ফ্লুরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করা এবং নিয়মিত দাঁতের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আপেল সহজে বহন করা যায় এবং সাধারণত রান্না ছাড়াই খাওয়া সম্ভব। তাই কর্মব্যস্ত জীবনে এটি একটি সুবিধাজনক স্বাস্থ্যকর জলখাবার।
চিপস, মিষ্টি বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে আপেল খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করলে খাদ্যতালিকায় ফলের পরিমাণ বাড়তে পারে। আপেলের সঙ্গে অল্প বাদাম বা চিনি ছাড়া দই খেলে খাদ্যে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির পরিমাণও বাড়ানো যায়।
শিশু থেকে প্রবীণ—বিভিন্ন বয়সের মানুষের খাদ্যতালিকায় উপযুক্ত পরিমাণে ফল রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে আপেলের টুকরো বয়স অনুযায়ী নিরাপদ আকারে কেটে দেওয়া উচিত, যাতে গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে।
আপেল খাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনও বাধ্যতামূলক সময় নেই। সকালের জলখাবার, দুপুরের খাবারের পরে বা বিকেলের নাশতা হিসেবে এটি খাওয়া যেতে পারে। খালি পেটে আপেল খেতেই হবে, এমন কোনও বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই।
কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চলতে পারেন:
প্রতিদিনের ফলের তালিকায় একটি মাঝারি আপেল রাখতে পারেন, যদি তা আপনার খাদ্যচাহিদার সঙ্গে মানানসই হয়।
খাওয়ার আগে পরিষ্কার জল দিয়ে আপেল ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
সম্ভব হলে খোসাসহ খান, কারণ খোসায়ও খাদ্যআঁশ ও উদ্ভিজ্জ উপাদান থাকে।
আপেলের রসের পরিবর্তে গোটা আপেলকে অগ্রাধিকার দিন।
শুধু আপেলের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন রঙের ফল ও শাকসবজি খান।
অধিকাংশ মানুষের জন্য আপেল নিরাপদ একটি ফল। তবে কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
যাঁদের আপেলে অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি খাওয়া উচিত নয়। সংবেদনশীল অন্ত্র বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS)-এর কিছু রোগীর ক্ষেত্রে আপেলে থাকা ফ্রুক্টোজ ও সরবিটল পেট ফাঁপা, গ্যাস বা অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
ডায়াবেটিস থাকলে আপেলের পরিমাণকে দৈনিক কার্বোহাইড্রেটের হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। আবার দীর্ঘস্থায়ী কিডনির রোগে যাঁদের পটাশিয়াম গ্রহণ সীমিত রাখতে বলা হয়েছে, তাঁদের ব্যক্তিগত খাদ্যপরিকল্পনা অনুযায়ী ফল বেছে নেওয়া উচিত।
‘প্রতিদিন একটি আপেল ডাক্তারকে দূরে রাখে’—কথাটি জনপ্রিয় হলেও আপেল কোনও রোগের নিশ্চিত প্রতিরোধক নয়। তবে এতে থাকা খাদ্যআঁশ, জল এবং বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান একে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার উপযোগী ফল করে তুলেছে।
নিয়মিত আপেল খাওয়ার পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালিয়ে গেলে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য হতে পারে। মনে রাখতে হবে, সুস্থ থাকার চাবিকাঠি কোনও একটি ফল নয়; বরং প্রতিদিনের সামগ্রিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস।