নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: বাংলার দুর্গাপুজোর আকর্ষণ শুধু বাঙালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এই উৎসবের টানে কলকাতায় ছুটে আসেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ। পুজোর শিল্পকলা, চোখধাঁধানো মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমার সৌন্দর্য, আলোর রোশনাই এবং মানুষের উচ্ছ্বাস বিদেশি অতিথিদেরও মুগ্ধ করে। কলকাতার দুর্গাপুজোর এই আন্তর্জাতিক আকর্ষণের কথাই আরও একবার সামনে এল অস্ট্রেলিয়ার হাই কমিশনার ফিলিপ গ্রিনের পুজো পরিক্রমাকে ঘিরে। শহরের শারদোৎসবের জাঁকজমক দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁর প্রশংসায় নতুন করে উঠে এসেছে বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসবের বিশ্বজনীন আবেদন।
কলকাতার দুর্গাপুজো মানেই এক অন্যরকম আবহ। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয় অভিনব থিমের মণ্ডপ। কোথাও ঐতিহ্যবাহী বাংলার স্থাপত্য, কোথাও ইতিহাসের ছোঁয়া, আবার কোথাও আধুনিক শিল্পকলার অভিনব প্রকাশ—সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে এক বিশাল সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী।
মণ্ডপের প্রতিটি কোণে থাকে শিল্পীদের সৃজনশীলতার ছাপ। বাঁশ, কাঠ, কাপড়, মাটি এবং নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি হয় অসাধারণ সব শিল্পকর্ম। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে আলোকসজ্জা, সংগীত এবং সামগ্রিক পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে কলকাতার দুর্গাপুজো এক অনন্য অভিজ্ঞতা উপহার দেয় দর্শনার্থীদের।
অস্ট্রেলিয়ার হাই কমিশনার ফিলিপ গ্রিনের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের কাছে এই উৎসবের আকর্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দুর্গাপুজোকে কাছ থেকে দেখার মাধ্যমে বিদেশি অতিথিরা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানই দেখেন না, তাঁরা বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক বন্ধনের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার দুর্গাপুজোর ভূয়সী প্রশংসা করে ফিলিপ গ্রিন এই উৎসবকে ‘পৃথিবীর অন্যতম সেরা উৎসব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর এই প্রশংসা বাঙালির কাছে নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। তবে এই নির্দিষ্ট উক্তিটির স্বাধীনভাবে যাচাই করা আনুষ্ঠানিক সূত্র পাওয়া যায়নি।
দুর্গাপুজোর বিশেষত্ব কেবল মণ্ডপের সৌন্দর্য কিংবা প্রতিমার কারুকার্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের আবেগ, পারিবারিক মিলন, বন্ধুত্ব, সামাজিক সম্প্রীতি এবং শিল্প-সংস্কৃতির এক বিশাল পরিসর। পুজোর কয়েকটি দিন কলকাতা যেন পরিণত হয় এক বৃহৎ মিলনক্ষেত্রে, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করেন।
এই অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশই দুর্গাপুজোকে অন্য অনেক উৎসবের থেকে আলাদা পরিচিতি দেয়। বিদেশি অতিথিরা যখন এই উৎসবের অংশ হন, তখন বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বেশি পরিচিতি লাভ করে।
কলকাতার দুর্গাপুজো দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র। প্রতিবার পুজোর সময় শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে ভিড় জমান অসংখ্য দর্শনার্থী। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আসেন প্রতিমা ও মণ্ডপের শিল্পকর্ম দেখতে, আবার অনেকে জানতে চান এই উৎসবের ইতিহাস, ধর্মীয় তাৎপর্য এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট।
দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর সর্বজনীন চরিত্র। পাড়ার ছোট পুজো থেকে শুরু করে বড় বাজেটের থিম পুজো—প্রতিটি আয়োজনেই মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্লাবের সদস্য, শিল্পী, কারিগর, আলোকশিল্পী, স্বেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিশ্রমে গড়ে ওঠে এই বিশাল উৎসব।
এই আয়োজনের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় বাংলার সাংস্কৃতিক শক্তি। দুর্গাপুজো আজ শুধুমাত্র ধর্মীয় উদ্যাপন নয়, বরং শিল্প, পর্যটন, অর্থনীতি এবং সামাজিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও পরিচিত।
বিদেশি কূটনীতিকদের কলকাতার দুর্গাপুজো পরিদর্শনের ঘটনা নতুন নয়। ২০২৬ সালের দুর্গাপুজো উপলক্ষে ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও নরওয়ের প্রতিনিধিদের কলকাতার বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য মণ্ডপ ঘুরে দেখার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে উৎসবের শিল্পকলা, আধ্যাত্মিক আবহ এবং মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তার কথা।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। বিদেশি অতিথিরা যখন নিজেদের দেশে ফিরে এই উৎসবের কথা তুলে ধরেন, তখন কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচিতি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে আবেগের আরেক নাম। সারা বছর ধরে মানুষ অপেক্ষা করেন এই কয়েকটি দিনের জন্য। নতুন পোশাক, অঞ্জলি, ধুনুচি নাচ, ঢাকের আওয়াজ, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য অনুভূতি।
অস্ট্রেলিয়ার হাই কমিশনার ফিলিপ গ্রিনের প্রতি আরোপিত প্রশংসাও সেই আবেগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর মণ্ডপ পরিক্রমা এবং দুর্গাপুজো নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব আন্তর্জাতিক স্তরে এই উৎসবের গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সব মিলিয়ে, কলকাতার দুর্গাপুজো যে বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববাসীর কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট। শিল্প, ঐতিহ্য, সম্প্রীতি এবং মানুষের মিলন—এই চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়েই দুর্গাপুজো আজ বিশ্বমঞ্চে বাংলার অন্যতম উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক পরিচয়।