নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: দুর্গাপুজোর মহা নবমীর রাতে ডায়মন্ড হারবারে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুলিশের ভূমিকা ঘিরে উঠল একাধিক প্রশ্ন। ভিড় এড়াতে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডায়মন্ড হারবার থানার পুলিশের তরফে বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হলেও, নবমীর রাতে সেই ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দুর্গাপুজো দেখতে আসা বহু দর্শনার্থী। তাঁদের অভিযোগ, একাধিক রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয় এবং অনেককে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অষ্টমী পর্যন্ত রাত প্রায় ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় নিরাপত্তা ও যান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কার্যকর ছিল। কিন্তু মহা নবমীর রাতে আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ডায়মন্ড হারবার ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বহু মানুষ প্রতিমা দর্শনের জন্য শহরে আসেন। দর্শনার্থীদের এই বাড়তি ভিড় সামলাতে গিয়েই একাধিক জায়গায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, ডায়মন্ড হারবারের রত্নেশ্বরপুর এলাকায় পুলিশের তরফে একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বড় গাড়ি, টোটো ও অটো চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাইক চালকদেরও আটকে দেওয়া হয়। পুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং যানজট এড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত ১১টার পর থেকে রত্নেশ্বরপুর বাইপাস ও মায়ের রোডের দিক দিয়ে একাধিক বাইক ডায়মন্ড হারবারের দিকে ঢুকতে শুরু করে। পাশাপাশি রেল কলোনির রাস্তা ব্যবহার করেও বহু বাইক ডায়মন্ড হারবার থানা সংলগ্ন বাইপাস এবং রেলগেট কলোনি এলাকায় পৌঁছয়। এর ফলে একদিকে যেমন বাইকের সংখ্যা বাড়তে থাকে, অন্যদিকে তেমনই যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বেসামাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ।
দর্শনার্থীদের একাংশের দাবি, যে সমস্ত রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, সেখানেই বিভিন্ন দিক থেকে যানবাহন ঢুকতে থাকায় সমস্যার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদেরও সমস্যায় পড়তে হয় বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।
মহা নবমীর রাতের যান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু যানবাহনকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও সেই অনুমতিপত্র বা পাশ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম মানা হয়নি। অভিযোগ, কিছু গাড়ি চলাচলের সুযোগ পেলেও সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতিমা দর্শনে আসা বহু মানুষকে বিভিন্ন জায়গায় আটকে দেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতে পুলিশের অনুমতি নিয়ে যাঁরা শহরে প্রবেশ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ গন্তব্যে পৌঁছতে সমস্যায় পড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, যাঁদের কাছে অনুমতিপত্র ছিল না, তাঁদের অনেককেই রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে দাবি দর্শনার্থীদের একাংশের।
এমন পরিস্থিতিতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোনও বৈষম্য করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে এই অভিযোগগুলির বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, ডায়মন্ড হারবারের রত্নেশ্বরপুর এবং কেল্লার মোড়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পাশাপাশি পারুলিয়ার মোড় ও মোহনপুর পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন এলাকাতেও নজরদারি চালানো হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
তবে এতগুলি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও শহরের ভিতরে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা গেল না কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বাইপাস ও রেল কলোনি সংলগ্ন রাস্তাগুলিতে কীভাবে এত বাইক প্রবেশ করল এবং সেগুলি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়দের একাংশ।
তাঁদের বক্তব্য, শুধু রাস্তার মুখে গাড়ি আটকে দিলেই যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কোন রাস্তা দিয়ে কতগুলি যানবাহন ঢুকছে, কোথায় বিকল্প পথ রাখা হচ্ছে এবং কোন এলাকায় দর্শনার্থীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে—এই সমস্ত বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় থাকা জরুরি। নবমীর রাতে সেই সমন্বয়ের অভাব ছিল বলেই তাঁদের অভিযোগ।
দুর্গাপুজোর সময় ডায়মন্ড হারবারের বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা দর্শনের জন্য পার্শ্ববর্তী এলাকার বহু মানুষ আসেন। মহা নবমীর রাতে আবহাওয়া ভালো থাকায় দর্শনার্থীদের সংখ্যা আরও বেড়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। কিন্তু যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে সমস্যার কারণে অনেকেই নির্বিঘ্নে প্রতিমা দর্শন করতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
দর্শনার্থীদের একাংশের বক্তব্য, পুজোর ভিড়ের কথা মাথায় রেখেই তাঁরা পুলিশের সহযোগিতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর ভরসা করে ডায়মন্ড হারবারে এসেছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধা, দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা এবং যানজটের মুখে পড়ে তাঁদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। পরিস্থিতির কারণে কেউ কেউ প্রতিমা দর্শন না করেই ফিরে গিয়েছেন বলেও অভিযোগ।
স্থানীয়দের আরও দাবি, পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকা জরুরি। কিন্তু নবমীর রাতে কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের আচরণ এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সমস্যায় পড়া দর্শনার্থীদের অনেকেই প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।
দুর্গাপুজোর মতো বড় উৎসবে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে মহা অষ্টমী ও নবমীর মতো দিনে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা আগে থেকেই থাকে। ফলে আগাম পরিকল্পনা, বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন এবং বিকল্প রাস্তার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা জরুরি।
ডায়মন্ড হারবারের নবমীর রাতের পরিস্থিতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর সেই প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের মতে, কোথাও যান চলাচল বন্ধ রাখা হলেও অন্য রাস্তা দিয়ে যানবাহন প্রবেশ করলে পুরো ব্যবস্থাপনাই ব্যাহত হতে পারে। তাই বিভিন্ন প্রবেশপথে সমন্বিত নজরদারি এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র জানতে পুলিশের বক্তব্য, যান নিয়ন্ত্রণের নির্দেশিকা এবং সেদিন রাতের বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কোনও ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও সমীচীন নয়।
মহা নবমীর রাতে ডায়মন্ড হারবারে যানজট ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তার নিরপেক্ষ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়দের একাংশ। তাঁদের প্রশ্ন, আগের দিনগুলিতে যে ব্যবস্থায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল, নবমীর রাতে সেই ব্যবস্থা কেন কার্যকর থাকল না? অনুমতিপত্র নিয়ে যান চলাচল, বাইপাসের বিভিন্ন প্রবেশপথ এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে কী ধরনের নির্দেশিকা কার্যকর ছিল, তা স্পষ্ট করারও দাবি উঠেছে।
পুজোর শেষ দিনগুলিতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং নির্বিঘ্নে প্রতিমা দর্শনের স্বার্থে প্রশাসনের আরও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। একই সঙ্গে পুলিশের তরফে অভিযোগগুলির ব্যাখ্যা দেওয়া হলে গোটা পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সব মিলিয়ে, মহা নবমীর রাতে ডায়মন্ড হারবারে যানজট ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগ নতুন করে প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার, এই অভিযোগের বিষয়ে ডায়মন্ড হারবার থানার পুলিশ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং ভবিষ্যতে বড় উৎসবের ভিড় সামলাতে কী পদক্ষেপ করা হয়।