নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: বাংলায় বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙা এবং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্কে এবার সামনে এসেছে গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রশ্ন। বুলডোজার দিয়ে বুকস্টল ভাঙার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ‘বুলডোজার রাজ’ বন্ধ করার দাবি উঠেছে। প্রতিবাদী বক্তব্যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বই পড়া, সাহিত্যচর্চা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের বই বিক্রি করা কি অপরাধ? বইয়ের দোকান ভাঙার ক্ষেত্রে যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা যদি পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তা ও রাস্তাঘাটের উন্নয়নে কাজে লাগানো হতো, তাহলে সাধারণ মানুষের আরও উপকার হতো।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুর্গাপুজোর সময় কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় বামপন্থী দলগুলির বইয়ের স্টল বসানোকে ঘিরে সংঘাত। ১৭ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতার যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে সিপিআইএমের একটি বুকস্টল সরানোর জন্য পুরসভার কর্মীরা আর্থমুভার নিয়ে পৌঁছন। প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে সেখানে উত্তেজনা তৈরি হয়। এর আগে ঢাকুরিয়া এলাকাতেও বামপন্থীদের বইয়ের স্টল ভাঙার ঘটনা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল।
বামপন্থীদের বুকস্টল ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে প্রতিবাদী বক্তব্য সামনে এসেছে, তার মূল সুর হলো—রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও বই পড়া ও সাহিত্যচর্চার অধিকারকে খর্ব করা উচিত নয়। বই মানুষের চিন্তাভাবনা, যুক্তিবোধ এবং সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম। সেই জায়গায় কোনও বাধা তৈরি হলে তা বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন প্রতিবাদীরা।
প্রতিবাদী বক্তব্যে ‘বুলডোজার রাজ’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করে প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে, বামপন্থীদের বইয়ের স্টল সরাতে যে ধরনের পদক্ষেপ করা হচ্ছে, তা কি সমানভাবে জনস্বার্থের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে? বিশেষত পুজোর সময় মণ্ডপে বিপুল জনসমাগম, রাস্তায় যানজট এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠেছে।
তবে বুকস্টল সরানোর ঘটনায় প্রশাসনের নির্দিষ্ট কারণ, অনুমতি সংক্রান্ত নথি এবং প্রযোজ্য নিয়মের বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও স্টল ভাঙার পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল কি না, তা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নথি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাংলায় দুর্গাপুজোর সময় বইয়ের স্টল বসানোর একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, প্রকাশনা সংস্থা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন পুজোর দিনগুলিতে বই বিক্রি ও সাহিত্যচর্চার প্রসার ঘটিয়ে থাকে। বামপন্থী দলগুলির বুকস্টলও দীর্ঘদিন ধরে এই পরিসরের অংশ। সেখানে রাজনৈতিক তত্ত্ব, প্রগতিশীল সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজচিন্তা এবং বিভিন্ন লেখকের বই পাওয়া যায়।
কিন্তু ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় এই বুকস্টলকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাত সামনে এসেছে। সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এর আগে বিধানসভায় বামপন্থীদের বুকস্টলে ‘শারদোৎসব’ শব্দ ব্যবহার নিয়ে আপত্তি জানিয়ে পুজো কমিটিগুলির উদ্দেশে বক্তব্য রেখেছিলেন। অন্যদিকে, বামপন্থী দলগুলি নিজেদের বইয়ের স্টল বসানোর অধিকার এবং সাংস্কৃতিক পরিসরে অংশগ্রহণের প্রশ্ন তুলেছে।
এই পরিস্থিতিতে বুকস্টল ঘিরে বিরোধ কেবল একটি অস্থায়ী দোকান সরানোর বিষয় হয়ে থাকছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় উৎসবের পরিসর, প্রশাসনিক নিয়ম এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন।
প্রতিবাদী বক্তব্যে চোরবাগানের দুর্ঘটনার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর উৎসবের সময় ভিড় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমনপথ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বুকস্টল ভাঙার জন্য প্রশাসনিক তৎপরতার সঙ্গে পুজোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার তুলনা করে প্রতিবাদীরা বলতে চাইছেন, মানুষের জীবনরক্ষা ও জনসুরক্ষার ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তবে বুকস্টল ভাঙার ঘটনা এবং চোরবাগানের পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা পৃথক বিষয়; দুটির মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে, এমন প্রমাণ ছাড়া তা দাবি করা যায় না।
তবুও এই দুটি প্রসঙ্গকে সামনে রেখে জনস্বার্থে প্রশাসনের অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। পুজোর সময় নিরাপদে ঠাকুর দেখা, পর্যাপ্ত পুলিশি ব্যবস্থা, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। একই সঙ্গে জনসাধারণের রাস্তা ব্যবহার, অস্থায়ী দোকান স্থাপন, নিরাপত্তা এবং অনুমতি সংক্রান্ত বিধিনিষেধও মানতে হয়। তাই কোনও বুকস্টল সরানোর ক্ষেত্রে প্রশ্ন হওয়া উচিত—সিদ্ধান্তটি কি প্রযোজ্য আইন ও নিয়ম মেনে নেওয়া হয়েছে? একই ধরনের পরিস্থিতিতে কি একই নিয়ম প্রয়োগ করা হচ্ছে? সংশ্লিষ্ট পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি?
বামপন্থীদের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বই বিক্রির সুযোগে বাধা তৈরি হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। অন্যদিকে, প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের তরফে অনুমতি ও জনপরিসর ব্যবস্থাপনার যুক্তি থাকলে সেগুলিও নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
এই বিতর্কের নিষ্পত্তি রাজনৈতিক স্লোগান বা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়, বরং স্বচ্ছ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আইনি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সকলের অধিকারকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত।
বাংলায় ‘বুলডোজার রাজ’ বন্ধ করার দাবিকে ঘিরে যে প্রতিবাদী বক্তব্য সামনে এসেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে বই পড়ার অধিকার, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ। দুর্গাপুজো বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম বড় উৎসব। সেই উৎসবে আনন্দ, সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক চর্চার পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বুকস্টল নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে আইনসম্মত পদক্ষেপ ও স্বচ্ছতা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর রক্ষা করা। একই সঙ্গে পুজোমণ্ডপে নিরাপত্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং রাস্তাঘাটের উন্নয়নের মতো বিষয়েও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা জরুরি।
বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু কেনাবেচার নয়; বই চিন্তা, প্রশ্ন ও জ্ঞানচর্চার পথ খুলে দেয়। তাই এই বিতর্কের শেষ কথা হওয়া উচিত—আইনের শাসন বজায় থাকুক, মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত থাকুক এবং উৎসবের দিনগুলিতে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাক।