নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: গ্রামবাংলায় স্বল্প পরিসরে পশুপালনের পাশাপাশি মুরগি পালনও আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে মুক্তাঙ্গন বা ফ্রি-রেঞ্জ পদ্ধতিতে বিভিন্ন জাতের মুরগি পালন করে ডিম ও মাংস উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এই পদ্ধতিতে দিনের একটি বড় অংশ মুরগিগুলিকে নির্দিষ্ট খোলা জায়গায় বিচরণ করতে দেওয়া হয়। সেখানে তারা পোকামাকড়, ঘাসের বীজ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি রাতে নিরাপদ ঘরে রাখা এবং পরিপূরক সুষম খাবার দেওয়ার মাধ্যমে মুরগির স্বাস্থ্য ও উৎপাদন বজায় রাখা যায়।
ভারতের কৃষি গবেষণা সংস্থা ICAR-এর তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত জাত নির্বাচন ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে মুক্তাঙ্গন এবং বাড়ির আঙিনায় মুরগি পালন গ্রামীণ পরিবারের জীবিকা ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়ক হতে পারে।
মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে মুরগিগুলিকে সারাদিন ছোট খাঁচায় আবদ্ধ না রেখে বেড়া দেওয়া খোলা জায়গায় চলাফেরা করার সুযোগ দেওয়া হয়। জমির পরিমাণ ও মুরগির সংখ্যার উপর নির্ভর করে এই জায়গা তৈরি করা যায় বাড়ির উঠোনে, ফলের বাগানে কিংবা খামারের পাশে।
তবে মুক্তাঙ্গন পদ্ধতি মানে মুরগিকে সম্পূর্ণ অবাধে ছেড়ে রাখা নয়। শিয়াল, কুকুর, বেজি, শিকারি পাখি এবং চুরির ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার জন্য নিরাপদ বেড়া ও রাতের আশ্রয় প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিষ্কার পানীয় জল, সুষম খাবার, টিকা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
সঠিক ব্যবস্থাপনায় এই পদ্ধতিতে মুরগির স্বাভাবিক বিচরণ বজায় রাখা সম্ভব। তবে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক খাদ্যের উপর নির্ভর করলে ডিম ও মাংস উৎপাদন কমে যেতে পারে। তাই বয়স, জাত এবং উৎপাদনের লক্ষ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত খাবার দিতে হবে।
মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে মুরগি পালনের জন্য দেশি জাতের পাশাপাশি উন্নত গ্রামীণ মুরগির জাতও বেছে নেওয়া যায়। তবে জাত নির্বাচন করতে হবে স্থানীয় আবহাওয়া, বাজারের চাহিদা এবং ডিম না মাংস—কোন উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে।
১. দেশি মুরগি: বাংলার গ্রামাঞ্চলে দেশি মুরগি পালনের দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। এরা সাধারণত খোলা পরিবেশে খাবার খুঁজে নিতে পারে। স্থানীয় বাজারে দেশি মুরগির মাংস ও ডিমের চাহিদা থাকলে এই পদ্ধতিতে পালন লাভজনক হতে পারে। তবে জাত ও পরিচর্যাভেদে ডিম উৎপাদন এবং বৃদ্ধির হার পরিবর্তিত হয়।
২. বনরাজা (Vanaraja): ICAR-এর উন্নত মুরগির জাতগুলির মধ্যে বনরাজা উল্লেখযোগ্য। এটি মুক্তাঙ্গন ও গ্রামীণ পরিবেশে পালনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। মাংস ও ডিম—দুই ধরনের উৎপাদনের উদ্দেশ্যে এই জাত বিবেচনা করা যেতে পারে।
৩. গ্রামাপ্রিয়া (Gramapriya): মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে ডিম উৎপাদনের উপর বেশি গুরুত্ব দিতে চাইলে গ্রামাপ্রিয়া একটি বিবেচনাযোগ্য জাত। গ্রামীণ ও উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে মুক্ত পরিবেশে পালনের উপযোগী ডিম উৎপাদনকারী জাত হিসেবে ICAR এই জাতের কথা উল্লেখ করেছে।
৪. কড়কনাথ (Kadaknath): কালো পালক ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত এই দেশি জাতটি মাংস উৎপাদনের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়। কিছু বাজারে এর চাহিদা ও বিক্রয়মূল্য তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে বেশি দাম পাওয়া নিশ্চিত নয়; স্থানীয় ক্রেতা ও বাজার যাচাই করে তবেই এই জাতের বাণিজ্যিক পালন শুরু করা উচিত।
৫. আসিল (Aseel): এটি একটি পরিচিত দেশি মুরগির জাত। উপযুক্ত পরিবেশে মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে পালন করা যায়। তবে এই জাতের মোরগের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা যেতে পারে। তাই একাধিক মোরগ একই জায়গায় রাখার সময় সতর্কতা প্রয়োজন।
এ ছাড়াও কাবেরি, গিরিরাজা, শ্রীনিধি এবং অন্যান্য উন্নত গ্রামীণ জাত বিবেচনা করা যেতে পারে। জাতের প্রাপ্যতা ও স্থানীয় পরিবেশ অনুযায়ী প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে সফলভাবে মুরগি পালনের জন্য প্রথমেই খামারের উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করা জরুরি। এমন স্থান বেছে নিতে হবে যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস রয়েছে এবং বৃষ্টির জল সহজে বেরিয়ে যেতে পারে।
খোলা জায়গার চারপাশে মজবুত বেড়া দিতে হবে। বেড়ার উচ্চতা ও গঠন এমন হওয়া দরকার যাতে মুরগি বাইরে চলে যেতে না পারে এবং বাইরের প্রাণী সহজে ঢুকতে না পারে। মুরগির সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিচরণক্ষেত্র রাখতে হবে। জায়গা কম হলে অতিরিক্ত ভিড়, মাটির দূষণ এবং রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রাতের জন্য বাঁশ, কাঠ, জাল বা অন্যান্য স্থানীয় উপকরণ দিয়ে কম খরচে ঘর তৈরি করা যায়। তবে ঘরটি যেন বৃষ্টির জল থেকে সুরক্ষিত হয়, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকে এবং মেঝে শুকনো রাখা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে মুরগি পোকামাকড়, বীজ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক খাদ্য খেতে পারে। কিন্তু এই খাবার থেকে তাদের সমস্ত পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয় না। তাই বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত পোলট্রি ফিড অথবা সুষম বিকল্প খাদ্য দিতে হবে।
ছোট বাচ্চার জন্য স্টার্টার ফিড, বাড়ন্ত মুরগির জন্য গ্রোয়ার ফিড এবং ডিম পাড়া মুরগির জন্য উপযুক্ত লেয়ার ফিড প্রয়োজন হতে পারে। ডিম পাড়া মুরগির ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পুষ্টির পর্যাপ্ত জোগান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিন পরিষ্কার পানীয় জল দিতে হবে। খাবারের পাত্র পরিষ্কার রাখা এবং বাসি, ছত্রাকযুক্ত বা পচা খাবার সরিয়ে ফেলা জরুরি। খাদ্যের খরচ কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে পুষ্টির ঘাটতি হতে দিলে ডিম উৎপাদন ও মুরগির বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে মুরগি পালনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্বাস্থ্য সুরক্ষা। খোলা পরিবেশে বিচরণ করার ফলে বাইরের পাখি বা অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমে কিছু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই মুরগির ঘর ও খাবারের পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
স্থানীয় রোগের পরিস্থিতি অনুযায়ী পশুচিকিৎসকের পরামর্শে নিউক্যাসল রোগ, ফাউল পক্স এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় রোগের টিকাকরণ পরিকল্পনা তৈরি করা উচিত। বাচ্চা কেনার সময় তাদের স্বাস্থ্য, বয়স এবং ইতিমধ্যে কোন কোন টিকা দেওয়া হয়েছে, তা জেনে নিতে হবে।
অসুস্থ মুরগিকে দ্রুত আলাদা করা, নতুন মুরগি আনার পর কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখা এবং মৃত পাখি নিরাপদভাবে নিষ্পত্তি করা জরুরি। হঠাৎ অনেক মুরগি অসুস্থ হয়ে পড়লে বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে দ্রুত পশুচিকিৎসা পরিষেবার সাহায্য নিতে হবে।
মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে পালন করা মুরগি থেকে ডিম ও মাংস—দুই ধরনের উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। তবে উৎপাদনের পরিমাণ নির্ভর করে মুরগির জাত, বয়স, খাদ্য, আবহাওয়া এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উপর।
ডিম উৎপাদনের জন্য নির্বাচিত জাতের স্ত্রী মুরগি পালন করা যেতে পারে। অন্যদিকে মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত বৃদ্ধির হার রয়েছে এমন জাত বেছে নেওয়া দরকার। একই খামারে বিভিন্ন জাত রাখলে তাদের খাবার, বৃদ্ধির হার এবং রোগ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার পার্থক্য বিবেচনা করতে হবে।
উৎপাদিত ডিম ও মুরগি সরাসরি স্থানীয় বাজার, খুচরো বিক্রেতা বা পরিচিত ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা যায়। তবে বাজারে বিক্রির আগে স্থানীয় নিয়ম, স্বাস্থ্যবিধি এবং প্রয়োজনীয় অনুমতির বিষয়গুলি জেনে নেওয়া উচিত।
নতুন উদ্যোক্তাদের প্রথমেই অনেক মুরগি নিয়ে বড় খামার শুরু না করে সীমিত সংখ্যক মুরগি দিয়ে কাজ শুরু করা ভালো। এতে খাদ্য, পরিচর্যা, রোগ প্রতিরোধ এবং বাজারজাতকরণের অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়।
খামার শুরুর আগে মুরগির বাচ্চা কেনার খরচ, ঘর ও বেড়া তৈরির খরচ, খাবার, টিকা, ওষুধ, শ্রম এবং পরিবহণের হিসাব করতে হবে। সম্ভাব্য আয় নির্ধারণের সময় ডিমের উৎপাদন, মুরগির বিক্রয়মূল্য এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হবে।
মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক খাদ্য পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত খাবার, নিরাপদ আশ্রয় এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত খরচ হয়। তাই এই পদ্ধতিতে পালন মানেই সব সময় কম খরচ বা বেশি লাভ—এমন ধারণা ঠিক নয়।
মুক্তাঙ্গন পদ্ধতিতে বিভিন্ন জাতের মুরগি পালন গ্রামীণ পরিবারের পুষ্টি, স্বনিযুক্তি এবং অতিরিক্ত আয়ের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। দেশি মুরগি থেকে শুরু করে বনরাজা, গ্রামাপ্রিয়া ও কড়কনাথের মতো জাত উপযুক্ত পরিস্থিতিতে বিবেচনা করা যায়। তবে সাফল্যের জন্য জাত নির্বাচন, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত বিচরণক্ষেত্র, নিরাপদ রাতের আশ্রয়, টিকাকরণ এবং বাজারের চাহিদা সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
পরিকল্পিতভাবে খামার পরিচালনা করলে মুরগি পালন একটি সম্ভাবনাময় গ্রামীণ উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে। শুরু করার আগে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের পরামর্শ নিলে ঝুঁকি কমানো এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।