নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক : শরীর সুস্থ রাখতে ভিটামিন ডি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য বজায় রাখা, খাবার থেকে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করা এবং পেশি ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই ভিটামিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পাওয়া, খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরের ভিটামিন শোষণের সমস্যার কারণে অনেকের শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ বা ভিটামিন ডি যুক্ত করা হয়েছে এমন পানীয় অন্তর্ভুক্ত করলে এই পুষ্টি উপাদান গ্রহণে সাহায্য হতে পারে। সম্প্রতি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনেও এমন চারটি পানীয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
১. ভিটামিন ডি যুক্ত দুধ
দুধ ক্যালসিয়াম, প্রোটিন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের পরিচিত উৎস। তবে সাধারণ দুধে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন ডি-এর পরিমাণ খুব বেশি নয়। কিছু দেশে বাজারজাত দুধে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি যোগ করা হয়, যা শরীরের দৈনিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ভিটামিন ডি যুক্ত এক কাপ দুধে সাধারণত প্রায় ১২০ IU ভিটামিন ডি থাকতে পারে। তবে ভারতের বাজারে সব দুধে এই ভিটামিন যোগ করা হয় না। তাই দুধ কেনার সময় প্যাকেটের পুষ্টিগুণের তালিকা পরীক্ষা করা জরুরি।
কীভাবে খাবেন? সকালের নাশতা বা সন্ধ্যার খাবারের সঙ্গে এক গ্লাস দুধ রাখা যেতে পারে। যাঁদের ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা বা দুধে অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের উপযুক্ত বিকল্প বেছে নেওয়া উচিত।
২. ভিটামিন ডি যুক্ত উদ্ভিদভিত্তিক দুধ
যাঁরা গরুর দুধ পান করেন না, তাঁদের জন্য সয়া, আমন্ড বা ওটস থেকে তৈরি পানীয় বিকল্প হতে পারে। তবে এই পানীয়গুলিতে স্বাভাবিকভাবে ভিটামিন ডি-এর পরিমাণ সাধারণত খুব কম থাকে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি যোগ করা হয়।
ভিটামিন ডি যুক্ত উদ্ভিদভিত্তিক দুধ বেছে নেওয়ার সময় প্যাকেটের উপাদান ও পুষ্টিগুণের তালিকা দেখা জরুরি। পাশাপাশি প্রোটিনের পরিমাণও বিবেচনা করা উচিত, কারণ সব ধরনের উদ্ভিদভিত্তিক দুধে সমান পরিমাণ প্রোটিন থাকে না।
কীভাবে খাবেন?চিনি ছাড়া ভিটামিন ডি যুক্ত সয়া বা অন্য উপযুক্ত উদ্ভিদভিত্তিক পানীয় সকালের নাশতা, ওটস অথবা স্মুদির সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে।
৩. ভিটামিন ডি যুক্ত কমলালেবুর রস
কমলালেবুর রস ভিটামিন সি-এর পরিচিত উৎস। তবে সাধারণ কমলালেবুর রসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভিটামিন ডি থাকে না। নির্দিষ্ট কিছু বাজারজাত কমলালেবুর রসে অতিরিক্ত ভিটামিন ডি যোগ করা হয়। এমন পানীয় ভিটামিন ডি গ্রহণ বাড়ানোর একটি বিকল্প হতে পারে।
গবেষণায় ভিটামিন ডি যুক্ত কমলালেবুর রস গ্রহণের ফলে রক্তে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এই ফলাফল নির্দিষ্টভাবে ভিটামিন ডি যুক্ত পানীয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; সাধারণ ফলের রসের ক্ষেত্রে নয়।
কীভাবে খাবেন?প্যাকেটে ভিটামিন ডি যুক্ত থাকার উল্লেখ রয়েছে কি না, তা দেখে পানীয় বেছে নিন। অতিরিক্ত চিনি রয়েছে এমন রস নিয়মিত বেশি পরিমাণে না খাওয়াই ভালো। ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার সমস্যা থাকলে পরিমাণের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
৪. মাশরুমের স্যুপ বা ব্রথ
মাশরুম উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর একটি সম্ভাব্য উৎস। বিশেষ করে অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে আনা কিছু মাশরুমে ভিটামিন ডি₂-এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে। সেই মাশরুম দিয়ে তৈরি স্যুপ বা ব্রথ খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনতে পারে।
তবে সব মাশরুমে সমান পরিমাণ ভিটামিন ডি থাকে না। কোন ধরনের মাশরুম ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে চাষ করা হয়েছে এবং কীভাবে রান্না করা হচ্ছে—তার উপর পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ নির্ভর করতে পারে। দীর্ঘক্ষণ রান্না করলে ভিটামিনের পরিমাণে পরিবর্তনও হতে পারে।
কীভাবে খাবেন? উপযুক্ত মাশরুম দিয়ে বাড়িতে কম লবণ ও কম চর্বিযুক্ত স্যুপ তৈরি করা যেতে পারে। তবে মাশরুমের স্যুপকে ভিটামিন ডি-এর নিশ্চিত বা উচ্চমাত্রার উৎস ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রতিদিন কতটা ভিটামিন ডি প্রয়োজন?
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণভাবে ১৯–৭০ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ১৫ মাইক্রোগ্রাম বা ৬০০ IU এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সিদের ২০ মাইক্রোগ্রাম বা ৮০০ IU ভিটামিন ডি প্রয়োজন। ব্যক্তিভেদে চাহিদা আলাদা হতে পারে।
ভিটামিন ডি-এর প্রধান উৎসগুলির মধ্যে রয়েছে সূর্যালোকের সাহায্যে ত্বকে এর উৎপাদন, কিছু তৈলাক্ত মাছ, নির্দিষ্ট মাশরুম এবং ভিটামিন ডি যুক্ত খাবার ও পানীয়। কেবল পানীয়ের উপর নির্ভর করে প্রত্যেকের দৈনিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি এড়াতে কী করবেন?
- খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার রাখুন।
- দুধ, উদ্ভিদভিত্তিক পানীয় বা কমলালেবুর রস কেনার সময় ভিটামিন ডি-এর পরিমাণ পরীক্ষা করুন।
- নিরাপদভাবে সূর্যালোক পাওয়ার সুযোগ থাকলে তা কাজে লাগান; তবে কতক্ষণ রোদে থাকা উচিত, তা ত্বক, আবহাওয়া ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।
- দীর্ঘদিন হাড়ে ব্যথা, পেশির দুর্বলতা বা ঘাটতির ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করবেন না। অতিরিক্ত ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বাড়িয়ে ক্ষতি করতে পারে।
শেষ কথা
প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে ভিটামিন ডি যুক্ত দুধ, উদ্ভিদভিত্তিক দুধ, ভিটামিন ডি যুক্ত কমলালেবুর রস এবং উপযুক্ত মাশরুমের স্যুপ অন্তর্ভুক্ত করলে এই গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান গ্রহণে সাহায্য হতে পারে। তবে সব পানীয় সমান পরিমাণ ভিটামিন ডি সরবরাহ করে না। তাই প্যাকেটের পুষ্টিগুণের তালিকা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখবেন:ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করতে প্রয়োজনে চিকিৎসক রক্তপরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। শুধু কোনও একটি পানীয় খেয়েই ঘাটতি পূরণ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।