নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক : বাঙালির পাতে ইলিশ মানেই এক আলাদা আবেগ। পদ্মার ইলিশের স্বাদ নিয়ে দুই বাংলার মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের আকর্ষণ। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ আমদানির জন্য অপেক্ষা করেন পশ্চিমবঙ্গের বহু মাছপ্রেমী। কিন্তু ২০২৬ সালে সেই চেনা বাণিজ্যিক ছবিতে দেখা গেল এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ আসার পরিবর্তে ভারত থেকেই বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বিপুল পরিমাণ ইলিশ মাছ। ফলে দুই প্রতিবেশী দেশের ইলিশ বাণিজ্যের গতিপথ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রকাশিত সংবাদ ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। এর একটি বড় অংশ এসেছে গুজরাটের ভরুচ অঞ্চল থেকে। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার পাইকারি মাছের বাজার এবং পেট্রাপোল সীমান্তও এই বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল, আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ইলিশ উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য পরিচিত। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশি ইলিশের চাহিদা বিশেষত দুর্গাপুজোর মরশুমে চোখে পড়ার মতো। তবে চলতি বছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ইলিশের জোগান কমে যাওয়া এবং ক্রেতাদের চাহিদার কারণে ভারতীয় ইলিশের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে বলে মাছ ব্যবসায়ীদের বক্তব্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের পিছনে মাছের প্রাপ্যতা, উৎপাদনের অঞ্চল, বাজারের চাহিদা এবং দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি নীতির মতো একাধিক বিষয় কাজ করছে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু কোন দেশের ইলিশ বেশি জনপ্রিয়, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সরবরাহ ও বাজার অর্থনীতির হিসাবও।
ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানো ইলিশের একটি বড় অংশ গুজরাটের ভরুচ অঞ্চল থেকে এসেছে বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ইলিশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, কিছু চালানে ডিমের পরিমাণ বেশি থাকে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, সিলেট এবং অন্যান্য অঞ্চলের নির্দিষ্ট ক্রেতা ও প্রক্রিয়াকরণকারী ব্যবসায়ীদের কাছে এই ধরনের মাছের চাহিদা রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে মাছ থেকে ডিম আলাদা করে প্রক্রিয়াকরণ ও পুনরায় রপ্তানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মাছের মাংসও শুকনো বা নোনতা মাছের পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের বাজারে ভারতীয় ইলিশের চাহিদার পিছনে শুধু সরাসরি খাদ্য হিসেবে মাছ খাওয়ার বিষয় নয়, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের চাহিদাও ভূমিকা রাখছে। <Cite refs={["turn986278search7","turn986278search9"]}/>
উত্তর ২৪ পরগনার পেট্রাপোল সীমান্ত ভারত-বাংলাদেশের স্থলবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। ইলিশের বাণিজ্যে নতুন এই প্রবণতা সীমান্ত এলাকার আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার গুরুত্বও সামনে এনেছে। মাছের মতো দ্রুত পচনশীল পণ্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজন যথাযথ পরিবহণ, সংরক্ষণ, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ছাড়পত্র এবং সীমান্তে দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ।
হাওড়ার পাইকারি মাছের বাজারের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ভারতীয় ইলিশ বাংলাদেশে পাঠানোয় পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাণিজ্যও এই নতুন পরিস্থিতির অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই রপ্তানি থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহণকর্মী এবং মৎস্যজীবীরা কতটা আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন, তা নির্ভর করবে বাণিজ্যের পরিমাণ, খরচ, বাজারদর এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উপর।
পশ্চিমবঙ্গের মাছপ্রেমীদের কাছে বাংলাদেশি ইলিশের আলাদা কদর রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর আগে পদ্মার ইলিশ কলকাতা ও আশপাশের বাজারে পৌঁছলে তা নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ পাঠানোর ঘটনাটি বাণিজ্যের প্রচলিত দিককে উল্টে দিয়েছে। তবে ভারতীয় ইলিশ বাংলাদেশে গেলেই যে পশ্চিমবঙ্গের বাজারে ইলিশের দাম কমবে বা পদ্মার ইলিশের অভাব পুরোপুরি মিটবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। মাছের প্রজাতি, উৎপাদনের অঞ্চল, স্বাদ সম্পর্কে ক্রেতাদের পছন্দ, পরিবহণ খরচ এবং সরবরাহের পরিমাণ—সবকিছুর উপরই বাজারদর নির্ভর করে।