নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক : কৃষিকাজে সেচের জন্য প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার করা হচ্ছে। জমিতে জল দেওয়া, সবজি চাষ, ধান উৎপাদন এবং অন্যান্য কৃষিকাজে মাটির নিচের জলের উপর নির্ভরতা বহু এলাকায় যথেষ্ট বেশি। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জল তোলা, সেচের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ না করা এবং ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণের বিষয়টি উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে জলসংকটের আশঙ্কা বাড়তে পারে। কৃষি উৎপাদন বজায় রাখার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জলসম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রামীণ এলাকায় কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হলে কিংবা জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখতে অনেক কৃষককে পাম্পের সাহায্যে মাটির নিচ থেকে জল তুলতে হয়। এই জল সেচের মাধ্যমে জমিতে পৌঁছয় এবং ফসল উৎপাদনে সাহায্য করে। কিন্তু কতটা জল প্রয়োজন, কোন সময়ে সেচ দিতে হবে এবং কতটা জল উত্তোলন করলে স্থানীয় জলস্তরের উপর চাপ পড়বে না—এই বিষয়গুলি বিবেচনা না করে জল ব্যবহার করলে পরিবেশের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
ভারতের বহু কৃষিপ্রধান অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জল সেচের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বৃষ্টিনির্ভর কৃষিতে অনিশ্চয়তা থাকায় কৃষকরা অনেক সময় নলকূপ, গভীর নলকূপ কিংবা বৈদ্যুতিক ও ডিজেলচালিত পাম্পের সাহায্যে জল তুলে জমিতে ব্যবহার করেন। এতে ফসলের প্রয়োজনীয় জল সরবরাহ করা সম্ভব হলেও দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত উত্তোলন চলতে থাকলে ভূগর্ভস্থ জলস্তরের উপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষ করে যে এলাকায় ভূগর্ভস্থ জল যত দ্রুত পুনরায় পূরণ হয়, তার চেয়ে বেশি পরিমাণে জল তোলা হয়, সেখানে জলস্তর নেমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর ফলে ভবিষ্যতে একই পরিমাণ জল পেতে আরও গভীর নলকূপ বা বেশি শক্তিশালী পাম্পের প্রয়োজন হতে পারে। এতে কৃষকের সেচের খরচও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সব এলাকায় পরিস্থিতি এক নয়। মাটির গঠন, বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ জলাধারের বৈশিষ্ট্য এবং জল উত্তোলনের পরিমাণ অনুযায়ী সমস্যার মাত্রা পরিবর্তিত হয়। তাই নির্দিষ্ট কোনও এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলস্তর কমছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত জলস্তর পরিমাপ ও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা জরুরি।
কৃষিকাজে সঠিক সময়ে এবং সঠিক পরিমাণে জল ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে ফসলের প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনা না করে দীর্ঘ সময় ধরে জমিতে জল দেওয়া হয়। আবার কোথাও কোথাও জমির জলধারণ ক্ষমতা, মাটির আর্দ্রতা এবং ফসলের বৃদ্ধির পর্যায় বিবেচনা না করেই সেচ দেওয়া হয়।
এই ধরনের ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত জল ব্যবহার হতে পারে। মাটির ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত জল নিচে নেমে যেতে পারে অথবা জমির এক অংশ থেকে অন্য অংশে বয়ে গিয়ে অপচয় হতে পারে। সব পরিস্থিতিতে এই জল নষ্ট হয় না—কিছু জল আবার ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু সেই জল কতটা পুনর্ভরণে সাহায্য করছে এবং কতটা জল প্রকৃত অর্থে অপচয় হচ্ছে, তা স্থানীয় পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।
তাই কৃষিকাজে শুধু বেশি জল ব্যবহার করলেই বেশি ফলন হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী সেচের সময় ও পরিমাণ নির্ধারণ করলে জল সাশ্রয়ের পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কমানো সম্ভব হতে পারে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলে কৃষির সঙ্গে নদী, খাল, বৃষ্টিপাত এবং মাটির লবণাক্ততার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মিঠে জলের প্রাপ্যতা, ভূপ্রকৃতি এবং ভূগর্ভস্থ জলসম্পদের বৈশিষ্ট্য একরকম নয়। কোথাও বৃষ্টির জল কৃষিকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, আবার কোথাও সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভর করতে হয়।
উপকূলবর্তী এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত উত্তোলনের পাশাপাশি লবণাক্ততার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। নির্দিষ্ট ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জল উত্তোলন উপকূলীয় জলাধারে নোনা জলের অনুপ্রবেশের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে সুন্দরবনের কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় এমন সমস্যা ঘটছে কি না, তা জানতে স্থানীয় জলস্তর ও জলের গুণমান পরীক্ষা করা দরকার।
সেচের জল ব্যবহারের আগে তার লবণাক্ততা এবং অন্যান্য গুণমান পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, লবণাক্ত জল দিয়ে দীর্ঘদিন সেচ দিলে মাটির গুণমান ও ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কৃষিতে জল ব্যবহার বন্ধ করা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং এমন পদ্ধতি গ্রহণ করা দরকার, যাতে ফসলের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি জলসম্পদের উপর চাপ কমানো যায়।
১. মাটির আর্দ্রতা বুঝে সেচ: নির্দিষ্ট সময় অন্তর অকারণে জল না দিয়ে মাটির আর্দ্রতা ও ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে।
২. ড্রিপ ও স্প্রিঙ্কলার সেচ: উপযুক্ত জমি ও ফসলের ক্ষেত্রে ড্রিপ বা স্প্রিঙ্কলার পদ্ধতি ব্যবহার করে জলের ব্যবহার আরও নিয়ন্ত্রিত করা যেতে পারে। তবে পদ্ধতি নির্বাচনের আগে খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থানীয় উপযোগিতা বিবেচনা জরুরি।
৩. বৃষ্টির জল সংরক্ষণ: পুকুর, জলাধার এবং উপযুক্ত বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা কৃষিকাজে বিকল্প জলের উৎস তৈরি করতে পারে। তবে ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণের ব্যবস্থা তৈরির আগে মাটির ধরন ও জলের গুণমান যাচাই করা দরকার।
৪. ফসলের পরিকল্পনা: স্থানীয় জলপ্রাপ্যতা এবং আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফসল নির্বাচন করলে অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন কমানো সম্ভব হতে পারে।
৫. জলস্তর পর্যবেক্ষণ: কৃষিপ্রধান এলাকায় নিয়মিত ভূগর্ভস্থ জলস্তর মাপা হলে কোথায় কতটা জল উত্তোলন হচ্ছে এবং কোথায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা দরকার, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।
৬. কৃষকদের প্রশিক্ষণ: কৃষি দফতর, কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে জলসাশ্রয়ী সেচপদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়তে পারে।
ভূগর্ভস্থ জল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। একবার কোনও এলাকায় জলস্তর উল্লেখযোগ্যভাবে নেমে গেলে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তাই কৃষিকাজের বর্তমান চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জলনিরাপত্তার কথাও ভাবতে হবে।
কৃষকদের একার পক্ষে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি, ভূগর্ভস্থ জলের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, জলসাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রসার এবং সেচ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সচেতনতা। পাশাপাশি কৃষকদের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে উপযুক্ত প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ জলের অবৈজ্ঞানিক ও অতিরিক্ত ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে জলসম্পদ এবং কৃষি অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই ফসল উৎপাদনের স্বার্থেই জলের ব্যবহার হতে হবে পরিকল্পিত, পরিমিত ও বিজ্ঞানসম্মত। আজ জল সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কৃষি ও পানীয় জলের নিরাপত্তা বজায় রাখার সুযোগও বাড়বে।