Home ফ্যাক্ট ফাইল পঞ্চায়েতের পাঁচ কাহন পৌর বার্তা জেলার চালচিত্র চাষী ভাই বলছি শরীর স্বাস্থ্য জেলার সেনাপতি মাঠে ময়দানে সম্পাদকিয় কলম
BREAKING NEWS
প্রযুক্তিতে ভারতের চর্চা গোটা বিশ্বে হবে   •   কলকাতার ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে বিশেষ বৈঠক, ঐতিহ্য ও প্রাণীকল্যাণে নতুন ভাবনা অগ্নিমিত্রা পালের   •   হুমায়ুন কবীরকে ঘিরে দুর্গাপুরে বিজেপির অভিনব প্রতিবাদ, প্রতীকী কবর ও ‘শ্রাদ্ধ’ ঘিরে চাঞ্চল্য   •   কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, বজ্রপাত ও দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা   •   ক্ষেতি হাই স্কুলে নবম সাব-জুনিয়র রাজ্য নেটবল চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬, তরুণ খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিলেন নিশীথ প্রামাণিক   •   প্রতিদিন নদী সাঁতরে স্কুলে যান শিক্ষক, ‘টিউব মাস্টার’ আবদুল মালিকের অনন্য কাহিনি

প্রতিদিন নদী সাঁতরে স্কুলে যান শিক্ষক, ‘টিউব মাস্টার’ আবদুল মালিকের অনন্য কাহিনি

07 Oct 2026
07:39 PM

নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: স্কুলে পৌঁছতে প্রতিদিন নদী পেরোতে হয়। সড়কপথে গেলে প্রায় ১২ কিলোমিটার ঘুরতে হয়, সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। তাই দীর্ঘ পথের বদলে প্রতিদিন কাদালুন্দি নদী সাঁতরে স্কুলে পৌঁছন এক শিক্ষক। কেরলের মালাপ্পুরমের গণিত শিক্ষক আবদুল মালিকের এই ব্যতিক্রমী যাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের নজর কেড়েছে।

প্রায় দুই দশক ধরে এইভাবেই নিজের কর্মস্থলে যাতায়াত করছেন আবদুল মালিক। মালাপ্পুরমের পদিঞ্জাত্তুমুড়ির মুসলিম লোয়ার প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন তিনি। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার জন্য নদী সাঁতরে পার হওয়াকে নিজের নিয়মিত যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবেই বেছে নিয়েছেন তিনি।

আবদুল মালিকের সঙ্গে থাকে স্কুলের প্রয়োজনীয় বইপত্র, খাবার এবং অতিরিক্ত জামাকাপড়। নদীতে নামার আগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ভালোভাবে মুড়ে নেন তিনি। এরপর সেই ব্যাগটি টায়ারের টিউবের সঙ্গে আটকে নিয়ে নদীতে নামেন। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে সাঁতার কেটে নদীর অন্য পারে পৌঁছে যান তিনি।

তবে এই যাত্রা মোটেও সহজ নয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে কাদালুন্দি নদীর জলস্তর ও স্রোত অনেকটাই বেড়ে যায়। প্রবল স্রোতের পাশাপাশি নদীতে ভেসে আসতে পারে গাছের গুঁড়ি ও নানা ধরনের আবর্জনা। কখনও কখনও সাপও চোখে পড়ে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দীর্ঘদিন ধরে নিজের যাতায়াতের এই পদ্ধতি বজায় রেখেছেন ওই শিক্ষক।

আবদুল মালিকের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে সময় বাঁচানোর বিষয়টিও। সড়কপথে দীর্ঘ ঘুরপথে যাতায়াত করতে অনেক বেশি সময় লাগে। অন্যদিকে স্থানীয় বাস পরিষেবার অনিয়মিত সময়সূচির কারণেও অপেক্ষা করতে হয়। ফলে তাঁর কাছে নিয়মিত নদী সাঁতরে স্কুলে পৌঁছনো তুলনামূলকভাবে দ্রুত এবং সুবিধাজনক বলে মনে হয়েছে।

তবে শুধু নিজের যাতায়াতের জন্যই নদীর সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্ক নয়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কাছেও তিনি অত্যন্ত পরিচিত মুখ। তাঁর প্রতিদিনের এই নদী পারাপার দেখে ছাত্ররা ভালোবেসে তাঁকে নাম দিয়েছে ‘টিউব মাস্টার’। শিক্ষকের এই অদ্ভুত অথচ দৃঢ় জীবনযাত্রা তাঁদের কাছেও অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছে।

আবদুল মালিক শুধু শ্রেণিকক্ষে গণিত পড়ান না, ছাত্রছাত্রীদের সাঁতার শেখানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন। নদীর পরিবেশ এবং জলদূষণ নিয়েও তিনি সচেতন। ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে নদী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগেও অংশ নেন তিনি। অর্থাৎ শিক্ষক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের নানা বিষয় সম্পর্কেও সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেন তিনি।

একজন শিক্ষকের প্রতিদিনের এই দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা তাই শুধুমাত্র যাতায়াতের গল্প নয়। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের দায়িত্ব পালন করার মানসিকতা, সময়ের মূল্য এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে আবদুল মালিকের জীবনযাত্রা।

কাদালুন্দি নদী প্রতিদিন তাঁর সামনে তৈরি করে নানা বাধা। কখনও স্রোত, কখনও বর্ষার জল, কখনও ভেসে আসা আবর্জনা—সবকিছুকে অতিক্রম করে তিনি পৌঁছে যান তাঁর স্কুলে। তাঁর ছাত্রদের কাছে তাই ‘টিউব মাস্টার’ শুধু একটি মজার ডাকনাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে একজন শিক্ষককে ঘিরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং অধ্যবসায়ের প্রতীক।

প্রতিদিন নদী পেরিয়ে স্কুলে পৌঁছনোর এই অসাধারণ অভ্যাস দেখিয়ে আবদুল মালিক যেন বুঝিয়ে দিয়েছেন—একজন শিক্ষকের দায়িত্ববোধ কখনও কখনও শ্রেণিকক্ষের সীমানা ছাড়িয়ে জীবনের বাস্তব পথেও প্রতিফলিত হয়। তাঁর এই প্রায় দুই দশকের যাত্রা আজও ছাত্রছাত্রী ও স্থানীয় মানুষের কাছে এক অনন্য গল্প হয়ে রয়েছে।