নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: ত্বক, হাড়, কার্টিলেজ, টেন্ডন ও লিগামেন্টের গঠনে কোলাজেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে প্রাকৃতিকভাবে কোলাজেন তৈরির পরিমাণ কমতে পারে। এ কারণে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়া, শুষ্কতা এবং জয়েন্টের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতায় পরিবর্তনের সঙ্গে কোলাজেনের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।
কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট মূলত হাইড্রোলাইজড কোলাজেন বা কোলাজেন পেপটাইড আকারে বাজারে পাওয়া যায়। শরীরে প্রবেশের পর এগুলি অ্যামিনো অ্যাসিড ও ছোট পেপটাইডে ভেঙে শোষিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে কোলাজেন পেপটাইড ত্বকের আর্দ্রতা ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর প্রভাব ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে এবং এটিকে ত্বকের বার্ধক্য ঠেকানোর নিশ্চিত উপায় হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
ত্বকের ক্ষেত্রে কোলাজেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল ত্বকের গঠন ও দৃঢ়তা বজায় রাখতে সাহায্য করা। বয়সের সঙ্গে কোলাজেনের উৎপাদন কমলে ত্বকে সূক্ষ্ম রেখা, বলিরেখা এবং স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কিছু গবেষণায় কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পর ত্বকের হাইড্রেশন ও ইলাস্টিসিটিতে সামান্য উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে জয়েন্টের ক্ষেত্রেও কোলাজেন নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। জয়েন্টের কার্টিলেজে কোলাজেন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত উপাদান। বিশেষ করে বয়সজনিত জয়েন্টের সমস্যা বা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে কোলাজেন পেপটাইড নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় জয়েন্টের ব্যথা বা অস্বস্তি কমাতে সম্ভাব্য উপকারের কথা উঠে এসেছে, যদিও সব গবেষণার ফল এক নয়।
কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এর মান ও উৎস। বাজারে পাউডার, ক্যাপসুল এবং পানীয়সহ বিভিন্ন ধরনের কোলাজেন পাওয়া যায়। এগুলির মধ্যে কোলাজেনের ধরন, পরিমাণ এবং অন্যান্য উপাদান আলাদা হতে পারে। তাই শুধু বিজ্ঞাপনের দাবি দেখে কোনও নির্দিষ্ট পণ্যকে কার্যকর বা সবার জন্য উপযুক্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত মনে করেন, শরীরে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের উপস্থিতি কোলাজেন তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন সি কোলাজেন সংশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই শুধুমাত্র সাপ্লিমেন্টের উপর নির্ভর না করে ফল, শাকসবজি, ডাল, ডিম, মাছ, দুধ বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারসহ সুষম খাদ্য বজায় রাখাও জরুরি।
ত্বকের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কোলাজেনের পাশাপাশি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত সূর্যালোক ত্বকের কোলাজেন ও ইলাস্টিনের ক্ষতি করতে পারে। ফলে কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলেও ত্বকের যত্নের অন্যান্য মৌলিক বিষয় উপেক্ষা করলে প্রত্যাশিত ফল নাও মিলতে পারে।
জয়েন্টের ক্ষেত্রেও শুধু কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের উপর নির্ভর করা উচিত নয়। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। জয়েন্টে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, ফোলা বা চলাফেরায় সমস্যা থাকলে তার কারণ নির্ণয় করা প্রয়োজন।
কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট সাধারণত অনেক মানুষের জন্য সহনীয় হলেও এটি সবার জন্য একইভাবে উপযুক্ত নয়। বিশেষ করে যাঁদের নির্দিষ্ট খাবারে অ্যালার্জি রয়েছে, যাঁরা নিয়মিত ওষুধ খান বা যাঁদের বিশেষ স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি রয়েছে, তাঁদের সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিভিন্ন কোলাজেন পণ্যের উৎসও আলাদা হতে পারে—মাছ, গরু বা অন্যান্য প্রাণিজ উৎস থেকে তৈরি পণ্য বাজারে পাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে, কোলাজেন শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত প্রোটিন এবং ত্বক ও জয়েন্টের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যে এর ভূমিকা রয়েছে। কিছু গবেষণায় কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এটি কোনও রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা নয় এবং ফলাফলও সবার ক্ষেত্রে একরকম নাও হতে পারে। তাই সাপ্লিমেন্টকে সুষম খাদ্য ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিকল্প হিসেবে না দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী একটি অতিরিক্ত সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।