Home ফ্যাক্ট ফাইল পঞ্চায়েতের পাঁচ কাহন পৌর বার্তা জেলার চালচিত্র চাষী ভাই বলছি শরীর স্বাস্থ্য জেলার সেনাপতি মাঠে ময়দানে সম্পাদকিয় কলম
BREAKING NEWS
সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাংয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা ড. সুকান্ত মজুমদারের   •   গ্রাম রোজগার সহায়কদের বার্ষিক সম্মেলনে পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের বার্তা, ‘সরকার ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকুন’   •   আরামবাগে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তি উন্মোচন, গাছের চারা বিতরণ; ‘প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয়নি’—দিলীপ ঘোষ   •   কৃত্রিমভাবে বোরো ধানের পরাগায়ন: উন্নত বীজ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পদ্ধতি   •   Pantaloons Presents Anandabazar Patrika Anandolok Puraskar 2026’-এর মঞ্চে এক ফ্রেমে গুণী শিল্পীরা   •   বর্ধমানের পথে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও যিশু সেনগুপ্ত, শহরে আসছে ‘বহুরূপী—দ্য গোল্ডেন ডাকু’

কৃত্রিমভাবে বোরো ধানের পরাগায়ন: উন্নত বীজ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পদ্ধতি

05 Oct 2026
05:27 AM

নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: বোরো ধানের চাষে ভালো ফলন এবং উন্নত মানের বীজ উৎপাদনের জন্য পরাগায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সাধারণত ধানের ফুলে প্রাকৃতিকভাবেই পরাগায়ন সম্পন্ন হয়। তবে গবেষণাগারে নতুন জাত উদ্ভাবন, সংকর ধান উৎপাদন এবং নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বীজ তৈরি করার ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন বা Artificial Pollination পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। নির্বাচিত দুটি ধানের গাছের মধ্যে নিয়ন্ত্রিতভাবে পরাগ সংযোগ ঘটিয়ে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের নতুন ধানজাত তৈরির ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

ধান মূলত স্ব-পরাগায়িত ফসল। অর্থাৎ একটি ধানের ফুলের পুংকেশর থেকে বের হওয়া পরাগরেণু একই ফুলের গর্ভমুণ্ডে পৌঁছে সাধারণত নিষেক ঘটায়। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য একটি নির্বাচিত গাছের পরাগরেণু ব্যবহার করাই কৃত্রিম পরাগায়নের মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে গবেষকরা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের দুটি ধানের গাছের মধ্যে পরিকল্পিত সংকরায়ন করতে পারেন।

কীভাবে সম্পন্ন হয় কৃত্রিম পরাগায়ন

কৃত্রিম পরাগায়নের ক্ষেত্রে প্রথমে সুস্থ ও কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পিতৃ ও মাতৃ গাছ নির্বাচন করা হয়। গাছের বৃদ্ধির পর্যায়, রোগমুক্ত অবস্থা, শীষের গঠন এবং কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে নির্বাচন করা হয়। এরপর ফুল ফোটার উপযুক্ত পর্যায় শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ধানের ফুল খুব ছোট হওয়ায় এই কাজ যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। নির্বাচিত মাতৃ গাছের ফুলে স্ব-পরাগায়ন যাতে না ঘটে, তার জন্য নির্দিষ্ট প্রজনন পদ্ধতি অনুসরণ করে পুংকেশরের পরাগ অপসারণ করা হয়। এই প্রক্রিয়াকে Emasculation বলা হয়। এরপর নির্বাচিত পিতৃ গাছ থেকে সংগ্রহ করা পরাগরেণু মাতৃ গাছের গর্ভমুণ্ডে প্রয়োগ করা হয়।

পরাগায়নের পর সংশ্লিষ্ট ফুল বা শীষকে চিহ্নিত করে রাখা হয়, যাতে পরবর্তী পর্যায়ে উৎপন্ন বীজের পরিচয় ও উৎস সম্পর্কে সঠিক তথ্য রাখা যায়। বীজ পরিপক্ব হওয়ার পর তা সংগ্রহ করে পরবর্তী পর্যায়ে পরীক্ষা করা হয়।

বোরো ধানে এই পদ্ধতির গুরুত্ব

বোরো মরশুমে ধান চাষের জন্য উন্নত জাতের বীজের চাহিদা রয়েছে। ফলন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং ধানের গুণমান—এই ধরনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ চলে। কৃত্রিম পরাগায়ন সেই গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

নির্দিষ্ট দুটি জাতের ভালো বৈশিষ্ট্য একত্রিত করার লক্ষ্যেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন কোনও একটি জাতের ফলন ভালো হলেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম হতে পারে। অন্য একটি জাতের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হতে পারে। গবেষণার মাধ্যমে এই বৈশিষ্ট্যগুলিকে পরবর্তী প্রজন্মে একত্রিত করার চেষ্টা করা হয়।

আবহাওয়ার ভূমিকা

কৃত্রিম পরাগায়নের সাফল্যের ক্ষেত্রে পরিবেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা এবং ফুল ফোটার সময়ের সঙ্গে পরাগের কার্যকারিতা সম্পর্কিত। অতিরিক্ত গরম, বৃষ্টি বা প্রতিকূল আবহাওয়া পরাগায়নের সাফল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই গবেষক বা বীজ উৎপাদনকারীরা সাধারণত ফুল ফোটার সময় এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কাজ করেন। একই সঙ্গে নির্বাচিত গাছের স্বাস্থ্য ও ফুলের পরিপক্বতাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।

বীজ উৎপাদনে সতর্কতা

কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করার পর উৎপন্ন বীজ যাতে অন্য কোনও জাতের সঙ্গে মিশে না যায়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। প্রতিটি ক্রস বা সংকরায়নের জন্য আলাদা পরিচয় বা লেবেল ব্যবহার করা হয়। বীজ সংগ্রহের সময়ও সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা জরুরি।

কারণ একটি গবেষণামূলক সংকরায়নের ফলাফল পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম ধরে পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে। কোন পিতৃ ও মাতৃ গাছ ব্যবহার করা হয়েছিল, কখন পরাগায়ন করা হয়েছিল এবং পরবর্তী প্রজন্মে কী বৈশিষ্ট্য দেখা গেল—এসব তথ্য ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কৃষকের জন্য কতটা প্রয়োজনীয়?

সাধারণ বোরো ধান চাষে কৃষকদের প্রত্যেককে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করার প্রয়োজন হয় না। কারণ বাণিজ্যিক ধানের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক স্ব-পরাগায়নের মাধ্যমে ধানের শীষে বীজ তৈরি হয়। কৃত্রিম পরাগায়ন মূলত ধান প্রজনন, গবেষণা, সংকর জাত তৈরির কাজ এবং নির্দিষ্ট মানের বীজ উৎপাদনের সঙ্গে বেশি যুক্ত।

তবে কৃষকদের জন্য এই প্রযুক্তির পরোক্ষ গুরুত্ব রয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে উন্নত জাত তৈরি হলে ভবিষ্যতে বেশি ফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী বা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম জাত কৃষকদের কাছে পৌঁছতে পারে।

কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে

বর্তমানে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। উন্নত বীজ, মাটি পরীক্ষা, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক সেচ ব্যবস্থার পাশাপাশি উদ্ভিদ প্রজনন প্রযুক্তিও কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বোরো ধানের ক্ষেত্রে কৃত্রিম পরাগায়নের মতো নিয়ন্ত্রিত প্রজনন পদ্ধতি ভবিষ্যতে আরও উন্নত জাত তৈরির গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, তাপমাত্রার ওঠানামা, জলসংকট এবং বিভিন্ন রোগের মোকাবিলায় নতুন বৈশিষ্ট্যের ধানের জাত তৈরির প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম পরাগায়ন একটি সূক্ষ্ম ও গবেষণাভিত্তিক প্রক্রিয়া। তাই মাঠ পর্যায়ে এই পদ্ধতি প্রয়োগের আগে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক পদ্ধতি, উপযুক্ত জাত নির্বাচন এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মাধ্যমে কৃত্রিম পরাগায়ন ধান গবেষণা ও উন্নত বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, বোরো ধানের কৃত্রিম পরাগায়ন শুধুমাত্র একটি কৃষি প্রযুক্তি নয়, বরং উন্নত জাত উদ্ভাবন ও ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক পদ্ধতি। পরিকল্পিত সংকরায়নের মাধ্যমে ধানের উৎপাদনশীলতা ও বিভিন্ন কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য উন্নত করার প্রচেষ্টা কৃষিক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।