নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বক্সা টাইগার রিজার্ভে ফের বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শুরু হল গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বাসন কর্মসূচি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনদপ্তর এবং ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (NTCA)-র যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আজকের বিশেষ কর্মসূচিতে উপস্থিত রয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব।
বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে একটি প্রায় তিন বছর বয়সি বাঘিনীকে বক্সা টাইগার রিজার্ভে নিয়ে আসা হয়েছে। বুধবার বিশেষ বিমানে বাঘিনীটিকে হাসিমারা বিমানঘাঁটিতে নিয়ে আসার পর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সড়কপথে বক্সার নির্দিষ্ট এনক্লোজারে পৌঁছে দেওয়া হয়। বাঘিনীটির গলায় ইতিমধ্যেই রেডিয়ো কলার লাগানো হয়েছে, যার মাধ্যমে তার গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
একসময় বক্সা টাইগার রিজার্ভে বাঘের উপস্থিতি ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে নানা কারণে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০১৮ সালের সর্বভারতীয় বাঘ গণনায় বক্সায় বাঘের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। সেই পরিস্থিতিতে বক্সার বাস্তুতন্ত্রে বাঘের পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
বন দফতর সূত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্প শুধু একটি বা কয়েকটি বাঘ এনে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাঘের উপযুক্ত আবাসস্থল তৈরি, পর্যাপ্ত শিকারের প্রাণীর সংখ্যা বজায় রাখা, বন্যপ্রাণীর চলাচলের করিডর উন্নত করা এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলিও পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।
বক্সায় পৌঁছনোর পর বাঘিনীটিকে সরাসরি গভীর জঙ্গলে ছেড়ে না দিয়ে প্রথমে নির্দিষ্ট প্রাকৃতিক এনক্লোজারে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে সে কতটা মানিয়ে নিতে পারছে, তার শারীরিক অবস্থা কেমন এবং তার স্বাভাবিক আচরণ কী—সবকিছুর ওপর নজর রাখছেন বনকর্মীরা। পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে পরবর্তী পর্যায়ে তাকে আরও বিস্তৃত প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। (Anandabazar)
বাঘিনীটির স্বাস্থ্য নিয়েও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে স্থানান্তরের আগে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল। বক্সায় পৌঁছনোর পরও চিকিৎসক ও বনকর্মীদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাকে।
বাঘ পুনর্বাসন কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক, NTCA এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বনদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় রয়েছে। বাঘিনীটিকে নিরাপদে স্থানান্তর করা থেকে শুরু করে নতুন পরিবেশে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ—প্রতিটি ধাপেই একাধিক সংস্থা যুক্ত রয়েছে।
এই বিশেষ কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতি কর্মসূচির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। বাঘ পুনর্বাসনের পাশাপাশি বক্সা ও ডুয়ার্সের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রকৃতি পর্যটনের সম্ভাবনাও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বাঘকে বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষস্থানীয় শিকারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি সংরক্ষিত অরণ্যে বাঘের উপস্থিতি খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবও বাঘ সংরক্ষণকে বৃহত্তর বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
বক্সায় বাঘের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ফলে আগামী দিনে ওই অঞ্চলের বনজ সম্পদ, বন্যপ্রাণী এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে নতুন গতি আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডুয়ার্স অঞ্চলের প্রকৃতি পর্যটনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাঁওয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, বক্সায় বাঘের উপস্থিতি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে পারে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান কর্মসূচিকে বৃহত্তর পুনর্বাসন পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী দুই বছরে বক্সা টাইগার রিজার্ভে আরও কয়েকটি বাঘ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল বাঘের জনসংখ্যা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যেই বলেছেন, “Once again, Buxa’s forests will reverberate with the roar of the tiger”—অর্থাৎ ফের বক্সার জঙ্গলে বাঘের গর্জন শোনা যাবে।
সব মিলিয়ে, বক্সা টাইগার রিজার্ভে বাঘ পুনর্বাসন কর্মসূচি উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে সামনে এসেছে। একটি বাঘিনীর হাত ধরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আগামী দিনে বক্সার জঙ্গলে স্থায়ী বাঘের জনসংখ্যা ফিরিয়ে আনতে কতটা সফল হয়, এখন সেদিকেই নজর পরিবেশ ও বন্যপ্রাণপ্রেমীদের।