নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: বর্ষার দাপট ধীরে ধীরে কমতে শুরু করতেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। জমি থেকে অতিরিক্ত জল নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে জমি পরিষ্কার, মাটি ঝুরঝুরে করা, বীজতলা তৈরির পাশাপাশি উন্নতমানের বীজ ও সার সংগ্রহের কাজ। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বহু এলাকায় শীতকালীন সবজির চাষ পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে বলে আশা করছেন কৃষকেরা।
বর্ষাকালে জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ চলে। বর্ষা শেষ হওয়ার পর সেই জমির একটি বড় অংশে চাষিরা শীতকালীন সবজি ফলানোর প্রস্তুতি নেন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় জমিতে জল দাঁড়িয়ে থাকার সমস্যা কম এবং মাটির জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ভালো, সেখানে ইতিমধ্যেই চাষের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে।
শীতকালীন সবজি চাষের জন্য জমি তৈরির কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকেরা প্রথমে জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করছেন। কোথাও জমি শুকিয়ে আসার পর লাঙল বা পাওয়ার টিলার দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করা হচ্ছে। এরপর জৈব সার, গোবর সার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সার প্রয়োগ করে জমিকে চাষের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।
অনেক কৃষক ইতিমধ্যেই বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, লঙ্কা প্রভৃতি সবজির চারা তৈরির জন্য আলাদা করে বীজতলা তৈরি করা হচ্ছে। চারা কিছুটা বড় হলে সেগুলি মূল জমিতে রোপণ করা হবে।
শীতের মরশুমে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের সবজির চাহিদা বাড়ে। সেই কথা মাথায় রেখে কৃষকেরা ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, পালং শাক, লাল শাক, ধনেপাতা, মুলো, গাজর, বিট, শিম, বরবটি, বেগুন, কাঁচালঙ্কা-সহ বিভিন্ন সবজির চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কৃষকদের একাংশের আশা, শীতকালীন সবজির বাজারে চাহিদা ভালো থাকলে উৎপাদনের পাশাপাশি আয়ও বাড়তে পারে। তবে চাষের খরচ, বীজ ও সারের দাম, শ্রমিকের মজুরি এবং বাজারদরের ওঠানামা নিয়ে তাঁদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে।
শীতকালীন সবজি চাষের ক্ষেত্রে আবহাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে জমিতে জল জমে গিয়ে সদ্য তৈরি চারা নষ্ট হতে পারে। আবার বৃষ্টির পর হঠাৎ তাপমাত্রা বেড়ে গেলেও কিছু সবজির চাষে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে বর্ষা শেষ হওয়ার সময়টায় কৃষকদের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতির ওপর বিশেষ নজর রাখতে হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জমিতে জল জমে থাকলে দ্রুত জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি বীজতলা তৈরির সময় রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে চারা রক্ষার দিকেও নজর দিতে হবে। জমির ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত ফসল নির্বাচন করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শীতকালীন সবজি চাষের সঙ্গে কৃষকদের আয়ের বিষয়টিও সরাসরি যুক্ত। বাজারে সবজির চাহিদা বাড়লে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু একই সময়ে বহু এলাকায় একসঙ্গে উৎপাদন বেড়ে গেলে বাজারদর কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে কোন সবজি কতটা পরিমাণে চাষ করা হবে, তা নিয়ে কৃষকদের হিসেব করে এগোতে হচ্ছে।
অনেক চাষি একসঙ্গে একাধিক ধরনের সবজি চাষের পরিকল্পনা করছেন। এতে একটি ফসলের দাম কমে গেলে অন্য ফসল থেকে কিছুটা লাভের সুযোগ থাকে। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের চাহিদা বুঝে চাষের পরিকল্পনা করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
বর্ষার শেষের দিকে গ্রামের কৃষিজমিতে এখন ধীরে ধীরে বাড়ছে ব্যস্ততা। কোথাও জমি চাষ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও বীজতলা তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও আগাম সবজির চারা রোপণের প্রস্তুতি চলছে। কৃষকদের আশা, অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো বাজারদর মিললে এবারের শীতকালীন সবজির মরশুম তাঁদের মুখে হাসি ফোটাবে।
সব মিলিয়ে বর্ষা বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের কৃষিপ্রধান এলাকাগুলিতে শুরু হয়েছে নতুন মরশুমের প্রস্তুতি। মাঠে এখন কৃষকদের ব্যস্ততা—শীতের সবুজ ফসলের অপেক্ষায় তৈরি হচ্ছে জমি। આગામી কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিভিন্ন এলাকার মাঠে দেখা যেতে পারে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, শিম, পালং, মুলোসহ নানা শীতকালীন সবজির চাষের দৃশ্য।