নিজস্ব প্রতিনিধি, জেলার বার্তা ডেস্ক: কলকাতার এ.জে.সি. বোস রোডে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস কলকাতায় চালু হল গামা নাইফ রেডিওসার্জারি কেন্দ্র। পূর্ব ভারতে উন্নতমানের নিউরোসায়েন্স চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য-সহ চিকিৎসক, স্বাস্থ্যক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা।
ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস কলকাতা (I-NK)-এর প্রধান হাসপাতাল ১৮৫/১, এ.জে.সি. বোস রোডে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির তরফে জানানো হয়েছে, গামা নাইফ রেডিওসার্জারি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে রেডিয়েশন পৌঁছে দেওয়ার একটি আধুনিক পদ্ধতি। প্রচলিত ওপেন ব্রেন সার্জারির মতো বড় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন না থাকায় উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণাত্মক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গামা নাইফ প্রযুক্তি মূলত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট ও ছোট অংশকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত রেডিয়েশন প্রয়োগ করে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত ব্রেন টিউমার, ব্রেন মেটাস্টেসিস, আর্টেরিওভেনাস ম্যালফরমেশন বা AVM, ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া, অ্যাকোস্টিক নিউরোমা, মেনিনজিওমা এবং কিছু নির্দিষ্ট পিটুইটারি টিউমারের মতো সমস্যায় এই চিকিৎসা ব্যবহার করা যেতে পারে। (Institute of Neurosciences Kolkata)
এই প্রযুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—চিকিৎসার লক্ষ্যস্থলকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করে আশপাশের সুস্থ মস্তিষ্কের টিস্যুর ওপর রেডিয়েশনের প্রভাব যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করা। হাসপাতালের বক্তব্য অনুযায়ী, উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসাটি সাধারণত ডে-কেয়ার পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা সম্ভব এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে গামা নাইফ প্রত্যেক রোগীর জন্য উপযুক্ত নয়; রোগীর রোগের ধরন, অবস্থান, আকার ও অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা সিদ্ধান্ত নেন।
ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস কলকাতার পক্ষ থেকে গামা নাইফ পরিষেবাকে পূর্ব ভারতে উন্নত নিউরো-রেডিওসার্জারির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১১ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের Gamma Knife Radiosurgery programme শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. অনুপম দত্তের প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম দিকের চিকিৎসা কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়া গিয়েছিল।
এর ফলে কলকাতা ও বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলের রোগীদের জন্য মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু জটিল রোগের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক রেডিওসার্জারি পরিষেবা পাওয়ার একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতদিন বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য অন্য শহর বা দেশের বাইরে যাওয়ার যে প্রয়োজন কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেখা দিত, এই ধরনের প্রযুক্তি সেই নির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে—যদিও রোগীভেদে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা আলাদা।
গামা নাইফ চিকিৎসা শুধুমাত্র একটি মেশিননির্ভর প্রক্রিয়া নয়। I-NK-এর তথ্য অনুযায়ী, এই পরিষেবার সঙ্গে নিউরোসার্জন, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, নিউরোরেডিওলজিস্ট এবং প্রশিক্ষিত নার্সিং কর্মীদের সমন্বিত একটি দল যুক্ত রয়েছে। রোগীর রিপোর্ট ও ইমেজিং পরীক্ষা বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।
এই আধুনিক চিকিৎসা পরিকাঠামোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্বও যোগ করে। তবে এই পরিষেবার মূল লক্ষ্য হিসেবে চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং রোগীদের জন্য উন্নত নিউরোসায়েন্স পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াকেই সামনে রাখা হয়েছে।
ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস কলকাতা বর্তমানে নিউরোলজি, নিউরোসার্জারি, নিউরো-রিহ্যাবিলিটেশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিষেবা দিয়ে থাকে। হাসপাতালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মূল ক্যাম্পাস এ.জে.সি. বোস রোডে এবং সেখানে ২৪ ঘণ্টার জরুরি পরিষেবাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, নিউরোসায়েন্সের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে রেডিওসার্জারির গুরুত্বও বাড়ছে। গামা নাইফের মতো প্রযুক্তি নির্দিষ্ট রোগীদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের বিকল্প বা পরিপূরক চিকিৎসা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে কোন রোগীর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হবে, তা নির্ভর করে রোগের ধরন, অবস্থান, আকার এবং রোগীর সামগ্রিক চিকিৎসাগত পরিস্থিতির ওপর।
কলকাতায় এই পরিষেবা চালুর ফলে পূর্ব ভারতের নিউরো-চিকিৎসা পরিকাঠামো আরও একটি আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হল। শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শমীক ভট্টাচার্যের উপস্থিতিকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও আগ্রহ দেখা যায়। একই সঙ্গে চিকিৎসাক্ষেত্রে এই নতুন পরিষেবা আগামী দিনে কতটা কার্যকরভাবে রোগীদের কাছে পৌঁছতে পারে, সেদিকেও নজর থাকবে।